ঢাকা থেকে
ইয়াঙ্গুনগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ উড়োজাহাজ গত বছর দুর্ঘটনায় পড়ে। উড়োজাহাজটি
ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়লে অল্পের জন্য রক্ষা পান ফ্লাইটটির
যাত্রীরা। যদিও স্থায়ীভাবে উড্ডয়ন সক্ষমতা হারায় উড়োজাহাজটি। ওই দুর্ঘটনার পর গঠিত
তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকাল। মূলত বৈমানিকদের ভুলেই
উড়োজাহাজটি সে সময় দুর্ঘটনায় পড়ে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ওই ফ্লাইটের
বৈমানিক ছিলেন নজরুল ইসলাম শামিম ও কো-পাইলট ছিলেন আনোয়ার পারভেজ আকাশ। ওই ঘটনার পর
বিমানের নিজস্ব এক তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করেছে
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
প্রসঙ্গত, গত বছর ৮ মে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে দুর্ঘটনায় পতিত
উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেলা ৩টা ২০ মিনিটে
উড্ডয়ন করে। সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় এ দুর্ঘটনা
ঘটে। উড়োজাহাজটি অবতরণের সময় সেখানে বৃষ্টি হচ্ছিল। সে সময় প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার
জন্য পিচ্ছিল রানওয়েকে দায়ী করা হয়। উড়োজাহাজে বিমান বাংলাদেশের এস২-এজিকিউ
ফ্লাইটটির যাত্রীরা অল্পের জন্য রক্ষা পান। উড়োজাহাজটিতে ২৮ যাত্রীসহ মোট ৩৪ জন
আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনাস্থল মিয়ানমারে হওয়ায় সে দেশের এয়ারক্রাফট ইনভেস্টিগেশন
ব্রাঞ্চ এটি নিয়ে তদন্ত চালায়। এতে সহায়তা করে বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট
ইনভেস্টিগেশন গ্রুপ (এএআইজি)।
তদন্তের চূড়ান্ত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈমানিক অবতরণের সময়ে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করেননি।
আবহাওয়া বিরূপ থাকার পরও বৈমানিক নিজে দায়িত্ব পালন না করে কো-পাইলটকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। উড়োজাহাজটি প্রথমে একবারে অবতরণ করতে না পেরে গো
অ্যারাউন্ড (অবতরণ করতে না পেরে আবার উড্ডয়ন) করে। পরবর্তীতে যখন অবতরণ করা হয়, তখন উড়োজাহাজের গতি ছিল অনেক বেশি। এক্ষেত্রে উড়োজাহাজটি
রানওয়ের নির্ধারিত জায়গা থেকে আরো বেশি দূরে চলে এসে বেশি গতিতে অবতরণ করে।
এক্ষেত্রে বৈমানিকরা উড়োজাহাজের ম্যানুয়াল ও অবতরণের কোনো মানদণ্ডই অনুসরণ করেননি।
প্রতিবেদনে আরো
বলা হয়েছে, এ দুর্ঘটনায় ৩৪ জন আহত হন। এর মধ্যে গুরুতর আহত
হন চার ক্রু ও আট যাত্রী। দুর্ঘটনায় গোটা উড়োজাহাজটিই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রতিবেদনে বিরূপ আবহাওয়ায় কো-পাইলটকে উড়োজাহাজ চালনার দায়িত্ব না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে
বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপের (এএআইজি)
প্রধান ক্যাপ্টেন
সালাউদ্দিন এম রহমতউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, মিয়ানমার
এয়ারক্রাফট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আজকেই (গতকাল)
এটি আমাদের হাতে এসেছে।
এখানে দুর্ঘটনার জন্য বৈমানিকের মিস হ্যান্ডলিংয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে।
দুর্ঘটনায়
বৈমানিক নজরুল ইসলাম শামিমও গুরুতর আহত হন এবং দেশে ফিরে সম্মিলিত সামরিক
হাসপাতালে (সিএমএইচ)
চিকিৎসা নেন। এছাড়া
ফ্লাইটের কেবিন ক্রু ফারজানা গাজী অভ্রও গুরুতর আহত হন। গত ১০ মে তাকে মিয়ানমার
থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে
যাওয়ায় ১২ মে তার অস্ত্রোপচার করা হয়।
মিয়ানমারে
সংঘটিত দুর্ঘটনার তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও একটি তদন্ত কমিটি করে। বিমানের
চিফ অব ফ্লাইট সেফটি শোয়েব চৌধুরীকে প্রধান করে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে
একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনেও বৈমানিকদের ভুলকে দুর্ঘটনার কারণ
হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বৈমানিক ও
কো-পাইলটকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে
বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। মামলার ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে
কর্তৃপক্ষ।
বিমানের তদন্ত কমিটিতে
আরো ছিলেন বিমানের ম্যানেজার
(কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স) নিরঞ্জন রায়,
ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজের প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সৈয়দ এম মুয়িম, ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার (লাইন
মেইনটেন্যান্স) মোহাম্মদ হানিফ, ম্যানেজার (ফ্লাইট সেফটি)
মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ
পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি।
বিমান বাংলাদেশ
এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
(এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মোকাব্বির হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, বিমানের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুজন বৈমানিককে
সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে।
এদিকে
মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ১২১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে বিমান
বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গত বছর ১৯ জুন সাধারণ বীমা করপোরেশনের পরিচালনা পর্ষদের ৫৯৮তম
সভায় এ ক্ষতিপূরণ পরিশোধের বিষয়টি অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে উড়োজাহাজ, আহত যাত্রী ও ক্রুদের ক্ষতিপূরণের অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ঢাকা-ইয়াঙ্গুন রুটে শুরু থেকেই যাত্রী সংকটে ভুগেছে
বিমান। বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে রুটটি পরিচালনা করে আসছিল বিমান কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তী সময়ে যাত্রী সংকটে গত ২৮ অক্টোবর রুটটিতে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়া
হয়। এর আগে রুটটিতে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট চলত।










