সরকারি নির্দেশনা অনুুযায়ী চট্টগ্রামের ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাতিল প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। পর্যায়ক্রমে ১৫ বছরের পুরনো সিএনজি অটোরিকশা ধ্বংস করে মালিকদের দেয়া হচ্ছে নতুন অটোরিকশার নম্বর। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এসব অটোরিকশা ভাঙার নিয়ম থাকলেও অবৈধভাবে মালিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। গত তিন বছরে এ প্রক্রিয়ায় ১২ হাজার সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপিং করতে বিআরটিএ চট্টগ্রামের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করেছে চট্টগ্রামের আট নতুন অটোরিকশা বিক্রয়কারী ডিলার প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তি এড়াতে শেষ পর্যন্ত দালাল ও ডিলার প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে মালিকদের। গত তিন বছর চট্টগ্রাম মেট্রো এলাকায় চলাচলরত প্রায় ১২ হাজার (চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত) অটোরিকশা স্ক্র্যাপিং করা হয়েছে। এসব অটোরিকশা থেকে ন্যূনতম ৬০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে দালাল চক্র। চলতি বছর সর্বশেষ আরো এক হাজার অটোরিকশা স্ক্র্যাপ করা হবে। এরই মধ্যে ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলো স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য বুকিং কার্যক্রমও শুরু করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বালুচরায় বিআরটিএর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে একাধিক দিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি অটোরিকশাই দালালের মাধ্যমে চুক্তি করে স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য দিতে প্রাথমিকভাবে অপারগতা প্রকাশ করেন উপস্থিত মালিক ও চালকরা। তবে পরবর্তী সময়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএ এলাকায় অপেক্ষারত মালিক ও চালকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপিংয়ের সর্বনিম্ন দর হচ্ছে ৬০ হাজার টাকা। এছাড়া যেসব অটোরিকশার কাগজপত্রে জটিলতা রয়েছে সেগুলোর জন্য ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে ডিলারদের। অর্থ প্রদানের পর সেলফোনের মাধ্যমে বিশেষ কোড নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ে পাঠালে ওই অটোরিকশা নির্ধারিত দিনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়। আর যারা ডিলার বা দালালদের মাধ্যমে যাননি, নানা অজুহাতে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপিংয়ের সঙ্গে যুক্ত পাঁচলাইশ থানাধীন বাদুড়তলা এলাকার বেশ কয়েকটি মোটরস শো-রুম ডিলার প্রতিষ্ঠান। এছাড়া নগরীর সর্বমোট ৮-১০টি ডিলার প্রতিষ্ঠান বিআরটিএর সঙ্গে যোগসাজশে অটোরিকশা স্ক্র্যাপিংয়ের অনৈতিক বাণিজ্যে যুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো ইমাম ডেন্টিং, জাফর অ্যান্ড কোম্পানি, রাজামিয়া অ্যান্ড সন্স, এসবি করপোরেশন, গাউসিয়া ট্রেডার্স, মেসার্স দিলু মিয়া, বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানি। মূলত যানবাহন কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিআরটিএর সখ্যতার কারণে নিরাপদ হিসেবে ডিলাররা এসব লেনদেনে সহযোগিতা করছে।
নগরীর ছোটপোল এলাকার উত্তরা মোটরসের ডিলার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইমাম ডেন্টিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. ইমাম হোসেন বলেন, ভেঙে ফেলা অটোরিকশার মালিকদের কাছে নতুন অটোরিকশা বিক্রি করছি আমরা। অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। নতুন অটোরিকশা কেনার পর নম্বর সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে সহযোগিতা দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, সরকার পরিবেশ দূষণ রোধে টু-স্ট্রোক অটোরিকশা উচ্ছেদ করে ২০০৩ সাল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে পরিবেশবান্ধব ফোর স্ট্রোক ১৩ হাজার করে সর্বমোট ২৬ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধন দেয়। এসব অটোরিকশার ইকোনমিক লাইফটাইম নির্ধারণ করা হয়েছে নয় বছর। পরবর্তী সময়ে মালিকদের দাবির মুখে এসব অটোরিকশার মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়িয়ে ১১ বছর নির্ধারণ করা হয়।
নগরীর পাহাড়তলী এলাকার নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, চারটি সিএনজি অটোরিকশা (চট্টমেট্রো-থ-১২-১১৩৯, চট্টমেট্রো থ-১২-০৭৪৮, চট্টমেট্রো থ-১২-১১৩৯ ও চট্টমেট্রো থ-১২-১০৩৩) স্ক্র্যাপ করতে বিআরটিএ কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। এরপর দালালরা প্রতিটি অটোরিকশা ধ্বংস করার জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। এসব ঘটনায় নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিআরটিএর সহকারী প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল হোসেন, পরিদর্শক মো. জামাল উদ্দিন ও অফিস পিয়ন মো. নুরুল ইসলামের নামে অভিযোগ দায়ের করেন।
জানা গেছে, শুরুতে ২০১৮ সালে স্ক্র্যাপ কার্যক্রমের জন্য সিএনজি/পেট্রলচালিত ফোর স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশা স্ক্র্যাপ কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আগের কমিটি ভেঙে বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে আহ্বায়ক ও মোটরযান পরির্দশক (চট্টমেট্রো-১ সার্কেল) মো. মিজানুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। পাশাপাশি কমিটিতে সদস্য রাখা হয় সহকারী পরিচালক (প্রকৌশল-চট্টমেট্রো-১) তোহিদুল হোসেনকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ম মেনেই চট্টগ্রামের অটোরিকশাগুলো পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কেউ যাতে ভোগান্তির মধ্যে না পড়েন সেজন্য নিয়ম মেনে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে স্ক্র্যাপিং করা হচ্ছে। এতে কোনো অনিয়ম বা ভোগান্তি হচ্ছে না। কেউ যদি বিআরটিএ কার্যালয়ের বাইরে কারো সঙ্গে নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক লেনদেন করে তাতে আমাদের কিছু করার নেই।
এদিকে অটোরিকশা ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিআরটিএর নানান অনিয়ম। পরিবেশ দূষণ রোধে এসব অটোরিকশা ধ্বংস করা হলেও একটি পুরনো অটোরিকশার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ যন্ত্রাংশই অক্ষত রেখে দেয়া হচ্ছে। ধ্বংসের সময় শুধু লোহার কয়েকটি পাত গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও মূল ইঞ্জিন ও চেসিস, পুরনো টায়ার অক্ষত রাখা হয়। যা পরবর্তী সময়ে পুরনো যন্ত্রাংশ হিসেবে খোলাবাজারে বিক্রি করা সম্ভব।
চালক ও মালিকদের অভিযোগ, ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি অটোরিকশার ওজন অন্তত ৫০০ কেজি। বর্তমান বাজারমূল্যে পুরনো লোহার দামের হিসাবে ধ্বংস করা অটোরিকশাটির দাম অন্তত ১৫-২০ হাজার টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বিআরটিএ প্রাঙ্গণেই স্থানীয় দালালরা এক-দেড় হাজার টাকায় এসব অটোরিকশা জোর করে মালিকদের কাছ থেকে কিনছে।









