কুয়েত সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে গত ১৩ এপ্রিল ফরওয়ানিয়া এলাকায় নির্দিষ্ট কেন্দ্রে যান চুয়াডাঙ্গার মাসুদুল হক মিতুল। সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে ওইদিন রাতেই তিনিসহ আরো কয়েক বাংলাদেশীকে নিয়ে যাওয়া হয় মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত এক ডিটেনশন ক্যাম্পে। এখন পর্যন্ত সে অস্থায়ী ক্যাম্পেই আটক রয়েছেন তিনি।
নিজের অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে মাসুদুল হক মিতুল গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, দুই-তিন দিন ক্যাম্পে অবস্থানের পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে এমন বলা হলেও, এখন প্রায় এক মাস হয়ে যাচ্ছে। মরুভূমির মধ্যে অস্থায়ী ক্যাম্পে এক ঘরে ৯০ জনের বেশি বাংলাদেশীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। প্রথম কয়েক দিন বিদ্যুৎ ছিল না। এখনো এসি দেয়া হয়নি। মরুভূমির মধ্যে প্রচণ্ড গরমে স্ট্রোক করে এরই মধ্যে তিন বাংলাদেশী মারা গেছেন।
অবৈধ অভিবাসীদের দেশত্যাগের জন্য ১-৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ ঘোষণা করে কুয়েত সরকার। এর আওতায় অবৈধ অভিবাসীদের ছাড়পত্র ও জরিমানা ছাড়াই সে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি উড়োজাহাজের টিকিট ও যাবতীয় খরচ বহন করারও ঘোষণা দিয়েছিল কুয়েত সরকার।
এ নিয়ে গত মাসে একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছিল কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস। সেখানে বলা হয়েছিল, অবৈধভাবে বসবাসকারীরা কোনো ধরনের আর্থিক জরিমানা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন। এক্ষেত্রে উড়োজাহাজের টিকিটসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে কুয়েত সরকার। কুয়েত ছেড়ে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট স্থানে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতে হবে। এ সময় থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় প্রয়োজনসংক্রান্ত ব্যবস্থা দেশটির সরকারই গ্রহণ করবে। অন্যদিকে এ সময়ের মধ্যে যারা দেশে ফিরে যাবেন, তারা সাধারণ নিয়মে আবার কুয়েতে আসার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। সাধারণ ক্ষমার আওতায় প্রায় এক মাস ধরে রাজধানী কুয়েত সিটির বাইরের চারটি ডিটেনশন ক্যাম্পে (আব্দালিয়া, সেবদি, মাঙ্গাফ ও কসর) অবস্থান করছেন সাড়ে চার হাজারের বেশি বাংলাদেশী। এদের সবাই এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থানরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের অভিযোগ, মরুভূমির মধ্যে ক্যাম্পে মানবেতন জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। ইফতার ও সাহরিতেও পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না তারা।
চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইউনুস একজন ডায়াবেটিক রোগী। তার দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রাও বেশি। তিনি যে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছেন, সেখানকার বাসিন্দাদের দেয়া হচ্ছে কেবল সাদা ভাত এবং সিদ্ধ ডাল। এ খাবার খেয়ে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তিনি। তিনি বলেন, খাবার পানি ও গোসলের জন্যও অনেক দূরে যেতে হচ্ছে। রোজার মাস চললেও আমাদের যা খেতে দেয়া হচ্ছে, তার মান খুবই খারাপ। কারো কাছেই জমানো অর্থ নেই যে বাইরে থেকে খাবার কিনব। এতদিন ক্যাম্পে আটকে রাখবে, তা আমরা বুঝতে পারিনি।
রাজবাড়ীর মোহাম্মদ রফিক কুয়েত গিয়েছেন এক বছর আগে। তিনি বলেন, প্রায় ২৫ দিন হলো অস্থায়ী ক্যাম্পে আছি। নিরাপত্তার দায়িত্বে যেসব কুয়েতি পুলিশ রয়েছে, তারা খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও কেউ খোঁজ নিচ্ছে না। এ অবস্থায় কবে দেশে ফিরতে পারব, তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
তিনি বলেন, করোনার কারণে পুরো কুয়েতে লকডাউন চললেও আমাদের রাখা হয়েছে মরুভূমির মধ্যে গাদাগাদি করে। প্রচণ্ড গরমে থাকার কষ্টের পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতেও আছি আমরা সবাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে এখন ফ্লাইট চলাচল বন্ধ। পাশাপাশি লকডাউনের কারণে কুয়েতেও স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ। এ কারণে শ্রমিকদের ফেরার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এর মধ্যেও আটকে পড়া শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে মোট শ্রমিক গিয়েছেন ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৩ জন। এর মধ্যে নারী শ্রমিক ৯ হাজার ১০৯ জন।










