দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বরিশাল বিমানবন্দরের বিদ্যমান রানওয়ের অ্যাসফল্ট সারফেস বেশ ক্ষয়ে গেছে। আবার দুটি উড়োজাহাজ পাশাপাশি দাঁড়ানো এবং চলাচলের জন্য নির্মিত অ্যাপ্রোনটিও পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় রানওয়ে দ্রুত মেরামত না করলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়তে পারে অবতরণ করতে যাওয়া উড়োজাহাজ। বরিশাল বিমানবন্দর পরিদর্শনের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

পরিদর্শনের সময় উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি দেখতে পায়, সুগন্ধা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কারণে বরিশাল বিমানবন্দরের রানওয়ের উত্তর প্রান্তে ৭৫ মিটারের ভেতরে চলে এসেছে নদী। চলমান ভাঙন অব্যাহত থাকলে উড়োজাহাজের ওঠানামা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে নদীভাঙনের কারণে বরিশাল বিমানবন্দরটিও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ৩ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুকেশ কুমার সরকারের (পরিকল্পনা) নেতৃত্বে একটি দল বরিশাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে আরো ছিলেন বেবিচকের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আরিফুজ্জামান। বিমানবন্দর পরিদর্শনের পর প্রতিনিধি দলের তদন্ত প্রতিবেদনে টার্মিনাল ভবনের নাজুক দশা, অরক্ষিত রানওয়ে, অ্যাপ্রোনের জটিলতা ও ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাসফল্ট সারফেসের উল্লেখসহ বিমানবন্দরের নানা দুরবস্থার বিষয় উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে বরিশাল বিমানবন্দরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বেবিচকের কাছে চিঠি পাঠায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুকেশ কুমার সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে তিন দফা সুপারিশও করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, বিমানবন্দরের রানওয়ের অ্যাসফল্ট সারফেস বেশ ক্ষয় হয়ে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দুটি উড়োজাহাজ পাশাপাশি দাঁড়ানো এবং চলাচলের জন্য নির্মিত অ্যাপ্রোনটি পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, যা দ্রুত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। এ বিষয়ে সুপারিশ হিসেবে বলা হয়, রানওয়ের অ্যাসফল্ট সারফেসসহ সমগ্র টার্মিনাল ভবন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করতে হবে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, বরিশাল বিমানবন্দরটি আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা সুগন্ধার তীরে অবস্থিত। তীব্র ভাঙন দেখা দেয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে মাত্র ৭৫ মিটার দূরের বিমানবন্দরের উত্তর পাশের সীমানা দেয়াল। নদীর মধ্যে চর পড়ায় নদীর প্রবাহের অধিকাংশ পানি কোলঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদীর কূল ভাঙছে এবং সেখানে স্রোতের তীব্রতাও অনেক বেশি। বরিশাল বিমানবন্দরের বাউন্ডারি ওয়ালের বিভিন্ন জায়গা উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। বাউন্ডারি ওয়ালের গ্রেড বিমের নিচ দিয়ে মানুষ যাতায়াতের পথ তৈরি করেছে। দেয়ালের বিভিন্ন অংশের ইট খুলে নিয়ে এলাকাবাসীর প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। পরিদর্শনকালে বিমানবন্দরের মধ্যে কয়েকজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। বিমানবন্দরের মধ্যে মানুষের যাতায়াত উড়োজাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীভাঙন মোকাবেলায় ১২০ মিটার দৈর্ঘ্য বরাবর ১০ হাজার ৩১০টি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। এজন্য কোনো প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৫০০ মিটার এলাকায় ৮৬ হাজারটি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হলে তীর রক্ষা সম্ভব হবে। তবে এ কাজের জন্য লাগবে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছ থেকে জানা যায়, সুগন্ধা নদীর বিভিন্ন ভাঙন এলাকার জন্য প্রায় ১ হাজার ২১২ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) করা হয়েছে। এ কাজের জন্য বিস্তারিত সমীক্ষা চলছে। এছাড়া নদীভাঙন প্রতিরোধে হাতে নেয়া হয়েছে একটি ড্রেজিং প্রকল্প।

প্রতিবেদনে বিমানবন্দরের ভাঙন রোধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবেলায় তদন্ত কমিটির তিন দফা সুপারিশে বলা হয়েছে, নদীভাঙনের হাত থেকে বিমানবন্দরকে রক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রায়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য যেসব স্থানে নিরাপত্তা দেয়াল নেই, সেগুলো নির্মাণ এবং রানওয়েসহ দ্রুত ভবন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বরিশাল বিমানবন্দর উন্নয়নে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নদীভাঙন থেকে বিমানবন্দর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।

উল্লেখ্য, ১৯৬৩ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নে ‘প্লান্ট প্রোটেকশন’ বন্দর হিসেবে দুই হাজার ফুট রানওয়ে নির্মাণ করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৮৫ সালে এটিকে বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে ঢাকা-বরিশাল রুটে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে ১৬০ দশমিক ৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ফুট এবং প্রস্থ ১০০ ফুট।

বর্তমানে দেশে আটটি সচল বিমানবন্দর রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক ও পাঁচটি অভ্যন্তরীণ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর ও সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ায় সেগুলোর বিষয়ে জোর তদারকি চললেও অবহেলায় রয়েছে রাজশাহী, বরিশাল, সৈয়দপুর, যশোর ও কক্সবাজার বিমানবন্দর।