জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চট্টগ্রামের হালদা নদীতে কমেছে মা-মাছের ডিম ছাড়া ও সংগ্রহের পরিমাণ। গত দুই মৌসুমে (২০২১ ও ২০২২ সাল) তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। চলতি বছরেও নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এ বছরের তীব্র তাপপ্রবাহে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়া, কর্ণফুলী ও হালদার পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং চট্টগ্রাম নগরীতে ওয়াসার পানি সরবরাহ ঠিক রাখতে গিয়ে হালদা নদীর পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাবে সময়মতো মা-মাছের ডিম ছাড়া এবং সংগ্রহ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, হালদায় প্রতি বছর মধ্য এপ্রিলের শেষ থেকে জুন নাগাদ অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় ডিম ছাড়ে কার্পজাতীয় (রুই, কাতল, মৃগেল, কালিবাউশ) মা-মাছ। মে মাসেই বেশির ভাগ সময়ে মা-মাছ ডিম ছাড়ে। এ সময় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল নদীর উজানেও হলে পানি ঘোলা, খরস্রোতা ও পানি ঠাণ্ডা হলে তখনি ডিম ছাড়ে মাছ। কিন্তু গত দুই মৌসুমে আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকায় নানা পদক্ষেপের পরও নদীতে ডিম ছাড়েনি মা-মাছ। অন্যদিকে চলতি বছর তীব্র তাপপ্রবাহ থাকায় এবং ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কয়েকটি ‘জো’ চলে গেলেও মা-মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি হালদায়। তবে ঘূর্ণিঝড় মোখার পর চট্টগ্রামে কিছুটা বৃষ্টিপাত হওয়ায় গত বুধবার দিবাগত রাতে নমুনা ডিম ছেড়েছে মা-মাছ। বৃহস্পতিবার অমাবস্যা থাকলেও ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মা-মাছ ডিম ছাড়েনি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ২২ হাজার ৩১৪ কেজি ডিম সংগ্রহ করেন স্থানীয় জেলেরা। এর পরের বছরগুলোতে কিছুটা ওঠানামা করলেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত তিন বছরের চিত্রে দেখা যায়, ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি, ২০২১ সালে ৮ হাজার ৫০০ কেজি এবং ২০২২ সালে ৬ হাজার ৫০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করেন হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীরা।
হালদা গবেষকদের দেয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই দেশব্যাপী তাপপ্রবাহ শুরু হয়। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়া, কর্ণফুলী ও হালদার পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি নগরীতে ওয়াসার পানি সরবরাহ ঠিক রাখার কারণে হালদা নদীর পানির স্তর নিচে নেমে গেছে এবং লবণাক্ততার উপস্থিতি বেড়ে যায়। যে কারণে শুরু থেকেই হালদায় চলতি মৌসুমে মা-মাছের ডিম ছাড়া নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন গবেষক এবং হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীরা।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান এবং হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে গত তিন বছরের আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা, ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল না হওয়া, পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মা-মাছ ডিম ছাড়েনি হালদায়। তাছাড়া বৃষ্টিপাত হলেও তাপমাত্রা এখনো নিচে না নামায় মাছের ডিম ছাড়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে আমাদের।’
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে অমাবস্যা শুরু হয়েছে, ১৬-২১ মে পর্যন্ত ডিম ছাড়ার জো রয়েছে। তবে চলতি অমাবস্যায় জো ছাড়াও সামনে পূর্ণিমার জো ১ থেকে ৬ জুন এবং অমাবস্যা জো ১৫ থেকে ২০ জুনের সময়কালে মা-মাছ ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা আছে। এ সময়ে বজ্রসহ ভারি বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢল নামলে মা-মাছ ডিম ছাড়বে।
ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘গত সপ্তাহে দুই-তিনদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে হালদার পরিবেশ ঠাণ্ডা হওয়ায় বুধবার দিবাগত রাতে মা-মাছ খুব সামান্য পরিমাণে নমুনা ডিম ছেড়েছে। যেহেতু জো চলছে, আবহাওয়াও বৃষ্টিপাতের জন্য উপযোগী সেজন্য আশা করা হচ্ছে এই জোতে মা-মাছ ডিম ছাড়বে।’
হালদা গবেষক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হালদা নদীর কিছু অংশে বুধবার রাতে সামান্য পরিমাণে নমুনা ডিম ছেড়েছে মা-মাছ। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই অমাবস্যা শুরু হয়েছে। গতকাল সকালে নদীতে জোয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে লবণাক্ততা চলে আসায় ডিমের অস্তিত্ব আর পাওয়া যায়নি। তবে আমরা আশাবাদী, যেকোনো সময়ে পাহাড়ি ঢল হলেই মা-মাছ নদীতে ডিম ছাড়বে। বৃষ্টিপাত এবং লবণাক্ততার কারণে চলতি মৌসুমে ডিম ছাড়তে দেরি করেছে মা-মাছ। নয়তো আরো আগে মা-মাছের ডিম ছাড়ার কথা।’
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ভারি বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। যেহেতু নদীতে মা-মাছের ডিম ছাড়ার জো চলছে এবং অমাবস্যাও শুরু হয়েছে সেজন্য মা-মাছের ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা আছে।’










