ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ও তার পরবর্তী আন্দোলনের দিনগুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। তার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরেন, যা নতুন প্রজন্মকে আন্দোলনের চেতনা উপলব্ধি করতে সহায়তা করেছে। তিনি শুধু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অংশগ্রহণকারী নন, ছিলেন আন্দোলনের এক নির্ভরযোগ্য সাক্ষী এবং এই ইতিহাস নির্মাতাদের একজন। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণে রেখেছেন অমূল্য অবদান। তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন, যা গবেষক ও পাঠক সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও অগ্নিগর্ভ মুহূর্ত হলো ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। অনেকে ১৯৫২ সালের ঘটনাপর্বকে ভাষা আন্দোলনের সমাপ্ত বলে মনে করেন। কিন্তু আহমদ রফিক এটা মানেননি কখনো। এ কারণে ভাষা আন্দোলনের যোদ্ধাদের ‘ভাষাসৈনিক’ না বলে ‘ভাষাসংগ্রামী’ বলার প্রস্তাব করেন তিনি। এ বিষয়ে তার যুক্তি হলো ‘সৈনিক’–এর কার্যপরিধি তো শুধু যুদ্ধকালীন আর ‘সংগ্রামী’র কার্যসীমা অনন্তকালীন। ফলে আহমদ রফিকের বাংলা ভাষা দাবির কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল আমৃত্যু। সেটি কখনো প্রবন্ধ-গবেষণায়, আবার কখনো বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার দেওয়ার মাধ্যমে।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য , একুশের মুহূর্তগুলো, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা, ভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের কথা এবং ভাষা আন্দোলন- টেকনাফ থেকে তেুঁতুলিয়া।
আহমদ রফিকের অবদান শুধু এখানেই সীমিত নয়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে তিনি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব অনুভব করেছিলেন। সেটিই তাকে রবীন্দ্রনাথের দিকে টেনে নেয়। দীর্ঘ জীবনে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে গভীরভাবে গবেষণা করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে মূল্যবান সংযোজন। তার দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নন, বরং আধুনিক বাঙালির মুক্তি-চিন্তা, মানবতাবাদ ও সমাজভাবনার অন্যতম নির্মাতা।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আহমদ রফিকের প্রবন্ধগ্রন্থগুলো হলো রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প, রবীন্দ্ৰভুবন পতিসর, রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ, রুশ বিপ্লব স্তালিন-বিতর্ক ও রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, ‘গীতাঞ্জলি’ ও নোবেল পুরস্কার, রবীন্দ্র-সাহিত্যের নায়িকারা দ্রোহে ও সমর্পণে।
আহমদ রফিকের অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে এবং জীবনানন্দ : সময় সমাজ ও প্রেম, নির্বাচিত কলাম, বাংলাদেশ : জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা, একাত্তরে পাকবর্বরতার সংবাদ ভাষ্য, কবিতা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতা। কবিতাগ্রন্থের মধ্যে নির্বাসিত নায়ক, বাউল মাটিতে মন, রক্তের নিসর্গে স্বদেশ, বিপ্লব ফেরারী, তবু, পড়ন্ত রোদুরে, শ্রেষ্ঠ কবিতা, ভালোবাসা ভালো নেই, নির্বাচিত কবিতা উল্লেখযোগ্য।
ভাষা আন্দোলন, গবেষণা, সাহিত্য ও প্রবন্ধে অনবদ্য অবদানের জন্য আহমদ রফিক ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯২ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য এবং ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হন। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে পেয়েছেন ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি ও স্বদেশে রবীন্দ্র পুরস্কার (১৪১৮) ।
লেখালেখি ও গবেষণার বাইরে আহমদ রফিক মহান একুশের চেতনা বাস্তবাস্তবায়নেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮৩ সালে সতীর্থদের নিয়ে ‘একুশে পরিষদ’ গঠন করেন। পরে ২০১০ সালে এটিকে বিস্তৃত পরিসরে ‘একুশে চেতনা পরিষদ’-এ রূপান্তর করা হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বিখ্যাত গানের রচয়িতা ও ভাষাসংগ্রামী আবদুল গাফফার চৌধুরীর সংগত মূল্যায়ন হলো, ‘আহমদ রফিকের সবচাইতে বড় অবদান ভাষাসংগ্রাম সংগঠনে এবং তার সঠিক ইতিহাস প্রণয়নে।’
আজকের বাংলাদেশ যখন বিশ্বদরবারে মাতৃভাষার অধিকারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আহমদ রফিকের অবদান বাঙালিদেরকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। তার অবদান করিয়ে দেয়, কেবল রাজনীতি দিয়ে নয়, গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চা দিয়েও জাতির মুক্তিতে অবদান রাখা সম্ভব। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, এ নিয়ে গবেষণা এবং সাহিত্যচর্চা তার জীবন ও কর্মকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তার বিপুল কর্মযজ্ঞে বাঙালি জাতির ইতিহাস হয়েছে সমৃদ্ধ, অগ্রগতি হয়েছে সাহিত্যেও।










