অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের যুগলবন্দিতে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে ৬ উইকেটের অনবদ্য এক জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। দুজনের ১৬৫ রানের জুটিতে ভর করে ২৫৬ রানের টার্গেট বাংলাদেশ ছুঁয়েছে ৩২ বল হাতে রেখে। চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গতকাল প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে কুশল মেন্ডিস ও জেনিত লিয়ানাগের ফিফটিতে ভর করে তিনশর দিকেই এগোচ্ছিল শ্রীলংকা। যদিও শেষ দিকে পেসারদের দারুণ বোলিংয়ে অতিথি দলটিকে ২৫৫ রানে অলআউট করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। বোলারদের এ অর্জন ব্যর্থ করতে চলেছিলেন ব্যাটাররা। ২৫৬ রানের টার্গেটে টাইগারদের শুরুটা হয় বিভীষিকাময়। ২৩ রানেই ৩ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। সাজঘরে ফিরে যান লিটন দাস, সৌম্য সরকার ও তাওহিদ হৃদয়। এরপর শান্তর ক্যাপ্টেন্স নকে (১২২*) অভাবনীয় এক জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। তাকে সুযোগ্য সঙ্গ দেন মুশফিক (৭৩*) ও মাহমুদউল্লাহ (৩৭)। মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ৬২ বলে ৬৯ ও পঞ্চম উইকেটে মুশফিককে নিয়ে ১৭৫ বলে ১৬৫ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক।

শান্তর তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি শ্রীলংকার বিপক্ষে ১১তম ওয়ানডে জয় এনে দেয় বাংলাদেশকে। ১২৯ বলে ১৩টি বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় খেলা ১২২ রান ওয়ানডেতে শান্তর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। গত বছর চেমসফোর্ডে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৭ ও লাহোরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১০৪ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। গতকাল মুশফিক ৮৪ বলে ৭৩ রানে অপরাজিত থাকেন। মাহমুদউল্লাহ করেন ৩৭ বলে ৩৭ রান। 

এর আগে টস জিতে ব্যাটিং করতে নামা শ্রীলংকাকে ঝড়ো সূচনা এনে দেন দুই ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা ও আভিস্কা ফার্নোন্দো। ১০ ওভারের প্রথম পাওয়ার প্লের পুরো সদ্ব্যবহার করে তারা ৭১ রান তুলে নেন। অবশেষে দশম ওভারে ফার্নান্দোকে আউট করে বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু এনে দেন তরুণ পেস বোলার তানজিম হাসান সাকিব। 

এখানেই শেষ নয়। টানা তিন ওভারে তিন উইকেট শিকার করে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান তানজিম। ফার্নান্দোকে আউট করার পর ১২তম ওভারে নিশাঙ্কা ও ১৪তম ওভারে সাদিরা সামারাবিক্রমাকে সাজঘরে ফেরান তিনি। এরপর সতর্ক হয়ে খেলতে শুরু করে লংকানরা। অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস ও চারিথ আসালঙ্কা ৭৩ বলে ৪৪ রান যোগ করে স্থিতি আনেন। আসালঙ্কাকে বোল্ড করে এ জুটি ভাঙেন স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর তরুণ জেনিত লিয়ানাগেকে নিয়ে ৬৮ বলে ৬৯ রানের আরেকটি দুর্দান্ত পার্টনারশিপ উপহার দেন কুশল। 

ভয়ংকর হয়ে ওঠা কুশলকে ইনিংসের ৩৭তম ওভারে সাজঘরে ফেরান অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদ। বাউন্ডারি হাঁকাতে গিয়ে মিডঅফে তিনি ক্যাচ তুলে দেন শান্তর হাতে। এরপর লিয়ানাগে বাংলাদেশ দলের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠলেও শেষ দিকে দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে ২৫৫ রানে অলআউট করে দেন তাসকিন ও শরিফুল। উভয়ই নেন তিনটি করে উইকেট। মিরাজ মিতব্যয়ী বোলিং করে বড় ভূমিকা রাখেন। তিনি ১০ ওভারে ৩৩ রান খরচ করে ১ উইকেট নেন। 

বোলারদের গড়ে দেয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই দলকে জেতান শান্ত-মুশফিকরা। ওয়ানডে দ্বৈরথে ৫৪ ম্যাচে এটা বাংলাদেশের ১১তম জয়। লংকানরা জিতেছে ৪২ ম্যাচ। এখন পর্যন্ত নয়টি দ্বিপক্ষীয় সিরিজের মধ্যে শ্রীলংকা ছয়টি ও বাংলাদেশ একটি সিরিজ জিততে সমর্থ হয়েছে। টাইগাররা ২০২১ সালে জিতেছে দুই দলের সর্বশেষ সিরিজটা। এবার কি দ্বিতীয় সিরিজ জয়ের উৎসব করতে পারবে টাইগাররা? সেটি করতে চাইলে আগামীকাল একই মাঠে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ কিংবা পরের সোমবার তৃতীয় ম্যাচ জিততে হবে শান্ত ও তার সহযোদ্ধাদের। 

১২২ রানের রাজসিক ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা খেলোয়াড় হওয়া শান্ত পুরস্কার হাতে নিয়ে বললেন, ‘নতুন বলে ব্যাট করাটা অনেক কঠিন হবে জানতাম। আমি তাই নিজের স্কিল কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। তবে পরের দিকে শিশিরের কারণে কাজটি সহজ হয়ে যায়।’

শ্রীলংকাকে ২৫৫ রানে আটকে দেয়ার সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আমি বোলারদের ওপর আস্থা রাখি। তাসকিন ও শরিফুলকে দিয়ে শুরুটা করাই। তারা দুজন চেষ্টা করছিল। তবে এ উইকেটে কঠিন ছিল। এরপর তারা যেভাবে ফিরেছে, সেটি সত্যিই আনন্দের।’

মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে ৬৯ ও মুশফিকের সঙ্গে ১৬৫ রানের পার্টনারশিপ নিয়ে শান্ত বলেন, ‘মাহমুদউল্লাহ যেভাবে ইনিংসটি খেলা শুরু করেন তা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। এরপর মুশফিক তার অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করলেন। আমরা তার সক্ষমতার কথা সবাই জানি। আশা করি, তিনি এমন ফর্ম ধরে রাখবেন।’

লংকান দলনায়ক কুশল মেন্ডিস মনে করেন, ২৮০ প্লাস রান হলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, ‘প্রথম ১০ ওভারে পাথুম ও আভিস্কা সত্যিই ভালো ব্যাট করেছেন। এরপর মিডল অর্ডার ধুঁকেছে। রাতের শিশির তাদের সাহায্য করেছে আর আমাদের কাজটি কঠিন করে তুলেছে। আশা করি, পরের ম্যাচে ভালো করব।’

ওয়ানডে সিরিজে ১-০-তে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। এর আগে সিলেটে তিন ম্যাচের টি২০ সিরিজে ২-১-এ জিতেছে শ্রীলংকা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

শ্রীলংকা: ৪৮.৫ ওভারে ২৫৫ (লিয়ানাগে ৬৭, কুশল ৫৯; সাকিব ৩/৪৪, শরিফুল ৩/৫১, তাসকিন ৩/৬০)। বাংলাদেশ: ৪৪.৪ ওভারে ২৫৭/৪ (শান্ত ১২২*, মুশফিক ৭৩*, ৩৭; মদুশঙ্কা ২/৪৪)। ফল: বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: নাজমুল হোসেন শান্ত (বাংলাদেশ)। সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০-তে এগিয়ে।