রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থার বহরে উড়োজাহাজের তুলনায় নেই পর্যাপ্ত বৈমানিক। এ অবস্থায় সংকট কাটাতে গত বছর বৈমানিক নিয়োগে একাধিক বিজ্ঞপ্তি দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বহরের চারটি বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন নিয়োগে যে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে আবেদনের সুযোগ পেয়েছেন ক্যাপ্টেন হিসেবে অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিও। আবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষার আগেই বেশ কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ব্যক্তি যোগাযোগ করেছেন। যারা আবার মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গিয়েছে, বহরে থাকা বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য ক্যাপ্টেন পদে পাঁচজন বৈমানিক নিয়োগ দিতে গত ২২ নভেম্বর এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিমান। সেখানে বলা হয়, আবেদনকারীদের অবশ্যই বাংলাদেশী হতে হবে। ন্যূনতম ছয় হাজার ঘণ্টা ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যার মধ্যে ৫০০ ঘণ্টা সর্বোচ্চ টেক অফ ওজন ৫০ টন বা তার বেশি উড়োজাহাজে ক্যাপ্টেন হিসেবে ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা অথবা বোয়িং-৭৭৭ কিংবা সমগোত্রীয় উড়োজাহাজে ১ হাজার ৫০০ ঘণ্টা কো-পাইলট ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অর্থাৎ ক্যাপ্টেন হিসেবে অভিজ্ঞতা নেই এমন বৈমানিকরা এতে আবেদন করতে পেরেছেন। এটিকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বৈমানিকরা বলছেন, বোয়িং-৭৭৭ অথবা বোয়িং-৭৮৭-এর মতো উড়োজাহাজে যারা ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগ পাবেন তাদের অবশ্যই বোয়িং-৭৩৭ বা সমগোত্রীয় উড়োজাহাজগুলোয় ক্যাপ্টেন হিসেবে ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কারণ বোয়িং-৭৭৭-এর মতো বড় উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেনের হাতে প্রায় ৪০০ যাত্রী ও মূল্যবান উড়োজাহাজের দায়িত্ব থাকে। এক্ষেত্রে মাঝারি আকারের উড়োজাহাজেও ক্যাপ্টেন হিসেবে ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই এমন বৈমানিক যদি বড় উড়োজাহাজে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পান সেটি আশঙ্কার।
উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, বিমানের বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন নিয়োগের আরেক বিজ্ঞপ্তিতেই কিন্তু এ ভুল করা হয়নি। বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য ক্যাপ্টেন পদে আটজন বৈমানিক নিয়োগ দিতে গত ২৮ নভেম্বর যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে বলা হয়, আবেদনকারীদের ন্যূনতম পাঁচ হাজার ঘণ্টা ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার আড়াই হাজার ঘণ্টা হতে হবে ক্যাপ্টেন হিসেবে। যদিও বোয়িং-৭৮৭ ও বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজ দুটি প্রায় একই আকারের।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ নভেম্বর বোয়িং-৭৭৭-এর ক্যাপ্টেন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর যেসব আবেদন পাওয়া গেছে তার মধ্যে থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১৩ জনকে পরীক্ষা নেয়ার জন্য চূড়ান্ত করা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য ওই ১৩ প্রার্থীকে গত ২০ ডিসেম্বর ই-মেইল করা হয়। গত ২৩ ডিসেম্বর তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় আটজন উত্তীর্ণ হন। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আটজনকে ই-মেইলের মাধ্যমে সাইকোমেট্রিক টেস্টের জন্য যোগাযোগ করতে বলা হয়। ৮ জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে তাদের সাইকোমেট্রিক টেস্ট সম্পন্ন হয়। যেটির ফলাফল প্রকাশ হলেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করবে বিমান কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গত নভেম্বরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত একজন ই-মেইলের মাধ্যমে কয়েকজন বৈমানিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ই-মেইলে তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িং-৭৭৭ ও বোয়িং-৭৮৭ উড়োজাহাজের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ক্রু নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ বিষয়ে আপনার ইচ্ছা ও প্রত্যাশাগুলো আমাদের জরুরি ভিত্তিতে জানান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন পদে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আটজনের মধ্যে সাতজনই ওই বিশেষ ই-মেইলটি পেয়েছিলেন। তাদের সেই ই-মেইলটি করা হয়েছিল গত নভেম্বর মাসের শেষ দিকে। অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য ১৩ জন প্রার্থীকে গত ২০ ডিসেম্বর যে ই-মেইলটি করা হয়েছিল তার মধ্যে সাতজনের সঙ্গেই বিমানের একটি পক্ষের যোগাযোগ ছিল।
এদিকে বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে বয়সের কোনো ঊর্ধ্বসীমা দেয়া নেই। সেক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ আবেদনের সুযোগ পেয়েছেন। তবে নিয়োগের চুক্তিটি যেহেতু পাঁচ বছরের হচ্ছে সে কারণে অধিক বয়সের কোনো বৈমানিক যদি নিয়োগ পান তবে তার প্রশিক্ষণের জন্য বিমানের যে অর্থ ব্যয় করতে হবে সেটির সুফল বিমান কতটুকু পাবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রসঙ্গত, বিমানে একজন কর্মচারী ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। তবে বৈমানিকদের ক্ষেত্রে এটি ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে মেডিকেলি ফিট হওয়ার পাশাপাশি ভ্যালিড লাইসেন্স থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, ফ্লাইট পরিচালনায় বৈমানিকের অদক্ষতায় (পাইলট এরর) পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা প্রমাণ হয়েছে এমন ব্যক্তি আবেদন করতে পারবেন না। অর্থাৎ পাঁচ বছর আগে যদি নিজের অদক্ষতায় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে এমন বৈমানিকের আবেদনের ক্ষেত্রে বাধা নেই।
বৈমানিক নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, বৈমানিক নিয়োগের যে বিজ্ঞপ্তিগুলো দেয়া হয় সেটি প্রস্তুত করতে বিমানের একটি বোর্ড রয়েছে। যেহেতু এটি একটি টেকনিক্যাল বিষয় সেই কারণে বোর্ডে বৈমানিকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই এ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ২১। এর মধ্যে ১৬টি নিজস্ব ও পাঁচটি লিজ নেয়া। নিজস্ব বাহনগুলোর মধ্যে বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৮ চারটি, বোয়িং-৭৮৭-৯ দুটি, বোয়িং-৭৩৭ দুটি ও ড্যাশ-৮ চারটি।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বর্তমানে বৈমানিক রয়েছেন ১৫৮ জন। ফ্লাইটের সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজন আরো ৪৩ জন। এর মধ্যে ২৬ জনকে আংশিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ছুটিতে রাখা হয়েছে। ১৫ জনের এখনো প্রশিক্ষণ শুরুই হয়নি। বিমানের সঙ্গে চাকরির চুক্তি অনুযায়ী, একজন পাইলটের মাসে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ৬০ ঘণ্টা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ৭৫ ঘণ্টা।









