প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে কোনো ব্যাংকের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এরই মধ্যে যেসব ব্যাংক আইপিওর আবেদন করেছে, তাদের পুঁজিবাজারে বাধ্যতামূলকভাবে বিনিয়োগ শর্ত দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আর ভবিষ্যতে যেসব ব্যাংক আবেদন করবে তাদেরও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে আইপিওতে আসতে হবে। এর আগে ব্যাংকের বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজারে বাধ্যতামূলকভাবে বিনিয়োগ থাকার শর্ত দিয়েছিল কমিশন।
পুঁজিবাজারের তারল্য সংকট নিরসনে গত বছর বিএসইসিসহ স্টেকহোল্ডাররা বাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিশেষ তহবিলের আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রত্যেক তফসিলি ব্যাংককে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রেখে একটি নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নির্দেশনা জারির পর থেকে এখন পর্যন্ত বেশকিছু ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য তহবিল গঠন করলেও বাকি রয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক। অবশ্য নির্দেশনা অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে কিনা, সে বিষয়ে প্রতিনিয়ত খোঁজ নেয় বিএসইসি। এক্ষেত্রে যারা এখনো বিনিয়োগ করেনি কিংবা আংশিক করেছে, তাদের বিনিয়োগের জন্য বলছে কমিশন।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার যেসব ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করবে, তাদের ক্ষেত্রে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করে বিনিয়োগের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করে শর্তারোপ করতে যাচ্ছে বিএসইসি। এরই মধ্যে যেসব ব্যাংক আইপিওর জন্য আবেদন করেছে, তাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে কিনা, সেটি আমরা প্রতিনিয়তই মনিটরিং করছি। যারা বিনিয়োগ করছে না তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে বিনিয়োগের জন্য। এছাড়া নতুন যেসব ব্যাংক তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করছে, তাদের আবেদনের পর পরই ২০০ কোটি টাকা বাধ্যতামূলকভাবে বিনিয়োগ করতে বলা হচ্ছে। আর বন্ডের ক্ষেত্রেও যদি কোনো ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ না করে, তাহলে তাদের বলা হচ্ছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করা পর্যন্ত বন্ডের সাবস্ক্রিপশনের টাকা তারা পাবে না।
তিনি আরো বলেন, গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বিএসইসির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে এ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে দুই দফায় ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করা হতে পারে বলে জানান তিনি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ বছর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন শুরু করা এনআরবিসি ব্যাংককে লিখিতভাবে কোনো শর্ত দেয়া না হলেও মৌখিকভাবে ব্যাংকটিকে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য বলা হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকসহ যেসব ব্যাংক আইপিও অনুমোদনের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে, তাদের ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য লিখিতভাবে শর্তারোপ করা হবে।
এদিকে সম্প্রতি বিশেষ তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের হালনাগাদ তথ্য তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছে জানতে চেয়েছে কমিশন। পাশাপাশি বিশেষ মিউচুয়াল ফান্ডে (এসপিএফ) তফসিলি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের তথ্যও জানতে চেয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত চিঠি সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালকদেরও অবহিত করেছে বিএসইসি।
ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পুঁজিবাজারে তারল্য সমাধানের লক্ষ্যে প্রত্যেক তফসিলি ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের জন্য ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলার অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলো বাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলো বিশেষ তহবিল থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছে। তবে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের তথ্য প্রতিনিয়ত সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে বাজারে ব্যাংকগুলোর কী পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে, সে তথ্য বিএসইসির কাছে নেই। তাই সাত কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে ব্যাংকগুলোকে গঠিত বিশেষ তহবিল ও তার বিনিয়োগের তথ্য জানাতে অনুরোধ জানানো হলো। একই সঙ্গে এসপিএকে বিনিয়োগের তথ্যও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জানানোর জন্য চিঠিতে উল্লেখ করে বিএসইসি।
দেশে বর্তমানে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৩১টি ব্যাংক। আর অতালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৩০। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত সব ব্যাংকের কাছেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় বলা হয়, আর্থিক খাতের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পুঁজিবাজারে তফসিলি ব্যাংকগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগের আইন রয়েছে। দেশের পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজারের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী হিসেবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্রমাগত তারল্যপ্রবাহ বজায় রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট ব্যাংক ও ডিলার লাইসেন্সধারী ব্রোকারেজ হাউজ) এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজকে শুধু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় এ তহবিল সরবরাহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
তফসিলি ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব উৎস থেকে তহবিল জোগান দিতে পারে। এছাড়া ধারণকৃত ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া আরো একটি উপায়ে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো। সেটি হলো, প্রথমে নিজ উৎস থেকে তহবিল গঠন করে পরবর্তী সময়ে ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। এ তহবিল থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ২৬ক ধারায় বর্ণিত বিনিয়োগসীমা অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে ট্রেজারি বন্ড বা বিলের মাধ্যমে এ সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। ট্রেজারি বন্ড বা বিলের রেপো মূল্যের ৫ শতাংশ মার্জিন হিসেবে রেখে তারল্য সুবিধা দেয়া হবে। নগদ রেপোর অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য আদায়যোগ্য অর্থ অপেক্ষা কম হলে তা এর আগে গৃহীত মার্জিন থেকে সমন্বয় করা হবে। সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হলে ব্যাংক তা দিতে বাধ্য থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯০ দিন মেয়াদি রেপো প্রদান করা হবে। রেপোতে বর্ণিত সময়সীমা ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পুনর্নবায়নের সুবিধা থাকবে। তবে এক্ষেত্রে তহবিল ব্যবহারের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচ্য হবে। তারল্য সুবিধা পেতে ব্যাংকগুলোকে যেসব শর্ত পরিপালন করতে হবে সেগুলো হলো, এ তারল্য সুবিধা পেতে অর্থের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশনের মহাব্যবস্থাপক বরাবর আবেদন করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ রেপো নবায়নের প্রয়োজন হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের একই বিভাগে আবেদন দাখিল করতে হবে। আবেদন দাখিলের সময় সম্পাদিত বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবের বিবরণ দাখিল করতে হবে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইন এবং সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারীকৃত অন্যান্য নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।










