বিশ্বজুড়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক মূলধারার বাইরে রাখার ফলে দেশগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রমশক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করার কারণে ১২টি দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের (এলএসএইচটিএম) ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এভিডেন্স ইন ডিজ্যাবিলিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মরগন ব্যাংকস এসব তথ্য তুলে ধরেন।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন অডিটরিয়ামে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তিনি এ কথা বলেন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), এলএসএইচটিএম এবং প্রোগ্রাম ফর এভিডেন্স টু ইনফর্ম ডিজ্যাবিলিটি অ্যাকশন (পিইএনডিএ) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
বক্তারা জানান, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ বা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে বসবাস করছে। এ জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও মানসম্মত কর্মসংস্থান থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি বঞ্চিত। প্রতিবন্ধিতাজনিত অতিরিক্ত ব্যয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সহায়তার মাধ্যমে যথাযথভাবে পূরণ না হওয়ায় দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো সম্ভব বলেও মত দেন বক্তারা।
সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ শতাংশ কর্মক্ষম। মোট প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে কর্মক্ষম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্কদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। কাজ পেলেও তারা মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী কর্মীদের মজুরি অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় গড়ে ২৬ শতাংশ কম। মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশে এই ব্যবধান যথাক্রমে ১০ ও ৯ শতাংশ।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষায় অতিরিক্ত এক বছর যুক্ত হলে ভবিষ্যতে তাদের মজুরি ৬ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। শৈশব থেকেই সহায়ক প্রযুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সারাজীবনের আয় প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে বাস্তবে প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে উপস্থিতির হার সাধারণ শিশুদের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ কম।
ড. মরগন ব্যাংকস বলেন, প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্কদের শ্রমবাজারের বাইরে রাখার ফলে ১২টি দেশে জিডিপির ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের পড়াশোনা ও কাজের বাইরে থাকার সম্ভাবনা অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। তবে কোন নীতিগত উদ্যোগগুলো কার্যকর—সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণভিত্তিক তথ্য এখনো সীমিত।
তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ও বেকার প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীদের জন্য গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরেন। ব্র্যাকের ‘স্টার প্লাস’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে জানান, এতে অংশগ্রহণকারী প্রতিবন্ধী তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, অন্তর্ভুক্তির অর্থ কাউকে তার অক্ষমতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা নয়; বরং তার সক্ষমতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া। প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে সমাজ ও অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণও বাড়ে।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামাজিক উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা তাহেরা জাবিন বলেন, প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে যুক্তরাজ্য বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পিইএনডিএ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক তথ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।










