প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মাদকপাচারসহ নানা হুমকির মুখে বাংলাদেশ। এ সময় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের ভুক্তভোগী উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা বিশাল আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় বহন করতে বাধ্য হচ্ছি। রাখাইন দিয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

তিনি বলেন, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যসহ আমাদের উন্নয়নমূলক চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থানের অনুমতি দিচ্ছি না।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে উদ্যোগের অভাব রয়েছে জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়নে ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমার থেকে। এর সমাধান সেখানেই আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করতে মিয়ানমার ও আরাকান সেনাবাহিনীর ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং রাখাইনে তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ শুরু করতে হবে।

এসময় তার বক্তব্যে তিনি সংকটের টেকসই সমাধানে সাতটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রথমত, রাখাইনে যুক্তিসঙ্গত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তব রোডম্যাপ প্রণয়ন করা; দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে মিয়ানমার ও আরাকান সেনাবাহিনীর ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা এবং সম্প্রতি যারা বাংলাদেশে এসেছেন এবং যারা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাদের ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা; তৃতীয়ত, রাখাইনকে স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করা এবং স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা; চতুর্থত, রাখাইন সমাজ ও শাসনে রোহিঙ্গাদের টেকসই সংহতকরণে আস্থা তৈরির পদক্ষেপে সহায়তা করা; পঞ্চমত, যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার সম্পূর্ণ তহবিলের জন্য দাতাদের সহায়তাগুলো একত্রিত করা; ষষ্ঠত, জবাবদিহিতা এবং পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার অনুসরণ করা এবং সপ্তমত, মাদকদ্রব্য সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি ধ্বংস করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারবে না বিশ্ব। আজ, আসুন আমরা এই সংকট সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ করার শপথ নেই। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

জাতিসংঘে এবারই প্রথম অনুষ্ঠিত হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন। এ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব শুরু হয়। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ৮০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক।

সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান। আরো রয়েছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা।