ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেছেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের মূল শর্ত হলো, বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সেই সংবেদনশীল মনের চরম অভাব রয়েছে। ক্ষমতার সিংহাসনে বসলে রাজনৈতিক ইশতেহার কর্পূরের মতো উবে যায়, আর অবহেলিত থেকে যায় প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক মানুষের মৌলিক দাবিগুলো।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে বণিক বার্তার কনফারেন্স রুমে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: আগামীর বাংলাদেশে করণীয়’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড এডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান), ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি এবং বণিক বার্তার যৌথ আয়োজনে এ জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
ইন্টারসেক্সুয়ালিটি ও প্রান্তিকতার সংকট নিয়ে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, দেশের একজন মানুষ যখন প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রান্তিকতায় ভোগেন, তিনি যদি নারী হন তবে তার সংকটের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ ইন্টারসেক্সুয়ালিটি বা বহুমুখী প্রান্তিকতা বুঝতে রাষ্ট্র এখনো ব্যর্থ। বাংলাদেশ বহু জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটিকে গ্রহণ করতে অনীহা দেখা যাচ্ছে। এমনকি ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যার কারণে বহুত্ববাদকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, যা প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অন্তরায়।
রাষ্ট্র কর্তৃক ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র মতো শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের আধিপত্যবাদী ধারণা জন্ম নেয়। ভিন্নতাকে শুধু স্বীকৃতি নয়, যথাযথ সম্মান দিতে হবে। রাষ্ট্র যদি ভিন্ন মত ও পথের মানুষকে ধারণ করতে না পারে, তবে অন্তত তাদের সহনশীলতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংরক্ষিত নারী আসনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এ আসনগুলো তাদের জন্য, যারা আর্থিক বা প্রান্তিকতার কারণে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠশিল্পী বা অভিনেত্রীরাই এসব আসন দখল করে আছেন। ফলে প্রকৃত প্রান্তিক নারীদের কণ্ঠ সংসদে পৌঁছায় না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আসন্ন নির্বাচনেও এ কাঠামোগত পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই।
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব রয়েছে। সারা বিশ্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নোবেল থেকে শুরু করে এভারেস্ট জয় পর্যন্ত অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, সুযোগ পেলে তারাও অসাধ্য সাধন করতে পারেন। সংবিধান বা কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়েও বড় প্রয়োজন মানুষের মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।










