এ সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকের বিষয়ে পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টি বৈঠকে উঠেছে এবং আমরা তাদের বলেছি এ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য। আমরা আশা করি, ভারত এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেবে।’
ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে। ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল, সবই আমরা তাদের দিয়েছি। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা বলেছি এ হত্যাকারীদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।’
দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির ওপরও বৈঠকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ৫ আগস্টের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের ব্যাপারে আমাদের যে পজিশন, আমরা ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি। সেটা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে ভারতের কর্তৃপক্ষ। আমাকে গতকালকেও (রোববার) তারা জানিয়েছে, আজকেও প্রধানমন্ত্রীকে সেটা বলেছে।’
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের সুযোগ দেয়ায় ঢাকা ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। তবে ভারত সরকার জানিয়েছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে দেয়া বক্তব্যও ভারত সরকার সমর্থন করে না।
ওই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে অবজ্ঞা করেছেন এবং ভারত তাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘একটা রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে—নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগ। দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, তার জায়গা হচ্ছে জুডিশিয়ারি। বাংলাদেশের একটি কম্পিটেন্ট কোর্ট তার বিচার করেছেন, তাকে দণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়ে কী হয়? তাকে কাস্টডিতে নেয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকে, সেটা আদালতে বলবে।’ এদিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। দুই বৈঠকের পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন দীনেশ ত্রিবেদী। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকলে তা উভয় দেশের জন্যই ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষও দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক দেখতে চায়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী জানান, এটি ছিল ‘পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ টু পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ’। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটি প্রথম সাক্ষাৎ হলেও তার কাছে সেটি প্রথম সাক্ষাৎ বলে মনে হয়নি বলেও জানান। তারেক রহমানের আচরণেরও প্রশংসা করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ইস্যু না থাকলে তো ডেমোক্রেসি থাকবে না। ইস্যু তো থাকবেই। তবে কোনো ইস্যু এ রকম না, যা আমরা সমাধান করতে পারি না। আমি কনফিডেন্টলি বলতে পারি, কোনো ইস্যু নেই যা আমরা বসে সেটল করতে পারি না।’
দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমরা শুধু সীমান্ত নয়, স্বপ্নও ভাগাভাগি করি। আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরো ভালো হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি দুই দেশের বিদ্যমান ইস্যুগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হলে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও আতিথেয়তার কথাও উল্লেখ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।










