পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট তৈরির প্রশিক্ষণ নেন বাগেরহাট পৌরসভার সোনাতলার আবু সাইদ। এরপর মেশিন কিনে তৈরি ব্লক দিয়ে বানান নিজের বাড়ি। তাকে দেখে প্রতিবেশীরাও আগ্রহ দেখান এবং ব্লক কেনার চুক্তি করেন। তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। চাহিদা থাকায় দিয়েছেন কারখানাও, যেখানে কাজ করেন ছয়জন শ্রমিক। কেবল আবু সাইদই নন, কারখানা দিয়ে সীমান্ত এ জেলায় ব্লক তৈরি করছেন কমপক্ষে ১২ উদ্যোক্তা।
ইটের বিকল্প এবং ব্যয়সাশ্রয়ী নির্মাণ উপকরণ সিমেন্টের ব্লক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছে বাংলাদেশ হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট। ফলে ইটের বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহারে মানুষের মধ্যে আগ্রহও বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব এ ব্লকের ব্যবহার বাড়লে আবাদি জমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি পরিবেশদূষণও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবু সাইদ জানান, ব্লকে ব্যয় কম। আবার পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বসতবাড়ি বানিয়ে অনেকেই বসবাস করছেন। এ দিয়ে ভবনের গাঁথুনিও হয় অনেক মজবুত ও হালকা। নিজের বাড়ির পাশাপাশি পাশের অনেকের বাড়িতেই ব্লক সরবরাহের চুক্তি করেন আবু সাইদ। বর্তমানে তার কারখানায় ছয়জন শ্রমিক কাজ করেন। ফ্লাই অ্যাশ ও মোটা বালি দিয়ে প্রতিদিন একজন শ্রমিক তৈরি করতে পারেন ২০০টি ব্লক। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তার মতো কমপক্ষে ১২ উদ্যোক্তার ব্লক তৈরির কারখানা রয়েছে। গ্রামীণ সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিং ও পোড়া ইট ব্যবহার না করে বাগেরহাটে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ব্লক ইট। এমন রাস্তা দেখে খুশি এলাকাবাসী ও যানবাহনচালকরাও।
বাগেরহাট সদর উপজেলার মাদ্রাসা বাজার এলাকায় ব্লক দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাকিলা বেগম। ছাদসহ দেড় হাজার ব্লক দিয়ে বানিয়েছেন ৬৫০ বর্গফুটের একতলা ভবন। মিস্ত্রি, প্লাস্টারসহ সব মিলিয়ে তার ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ টাকার মতো। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাকরির সুবাদে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমি ঢাকায় থাকি। মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে থাকার একটি ছোট ঘর করেছি। মাহবুব নামের এক ব্লক কারিগরের পরামর্শে মূলত ব্লক দিয়ে এটি তৈরি করি। ঘরটি দেখতেও অনেক সুন্দর হয়েছে। একটি নতুনত্ব আছে। আমার ব্যয়ও অনেক কম পড়েছে।’
ভবন তৈরির কারিগর মাহবুব আলম বলেন, ‘আমি নিজেই ব্লক তৈরি করি। এলাকায় কেউ ব্লক দিয়ে বাড়ি করতে চাইলে তাও বানিয়ে দিই। আমার সঙ্গে দক্ষ শ্রমিকও থাকেন। শাকিলা বেগমের বাড়িটি ইট দিয়ে তৈরি করতে কমপক্ষে সাড়ে ৫ লাখ টাকা লাগত। আমার পরামর্শে তিনি ব্লক দিয়ে করেছেন। এতে যেমন টাকা সাশ্রয় হয়েছে, শীত-গরমেও আরামে থাকতে পারবেন।’
শুধু হলো ব্লকই নয়, ইকোব্রিক, ইউনি ব্লক ও পার্কিং টাইলস তৈরি করা হচ্ছে বাগেরহাটে। কম খরচে স্বল্প সময়ে টেকসই বাড়ি নির্মাণ করতে পেরে খুশি বাড়ির মালিকরা। বাগেরহাট শহরের সোনাতলা এলাকায় কংক্রিটের ব্লক দিয়ে দুইতলা বাড়ি বানিয়েছেন সরকারি পিসি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. সাইফুর রহমান ফারুকী শামীম। ইটের বদলে ব্লক ব্যবহার করায় তার অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যয় কম হয়েছে জানিয়ে বলেন, ‘পুরনো একটি সেমি অটো মেশিন দিয়ে নিজে ব্লক তৈরি করেছিলাম। পাঁচটি ইটের সমান প্রতিটি ব্লক তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ টাকা। এগুলো দিয়ে করায় প্লাস্টার ও গাঁথুনির জন্য ব্যয় কম হয়েছে।’
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাগেরহাটে পিকেএসএফের ‘সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে কংক্রিটের ব্লক, পার্কিং টাইলস নির্মাণে দক্ষ শ্রমিক ও উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় নাগরিকদের সচেতন করতে সভা-সেমিনার, লিফলেট, পোস্টার বিতরণসহ বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণাও চালাচ্ছে কোডেক। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে বাগেরহাট ও আশপাশ এলাকায় এরই মধ্যে ১৫ উদ্যোক্তা তৈরি করা হয়েছে, যারা প্রতি মাসে লক্ষাধিক ব্লক তৈরি করে বাজারজাত করছেন। এ তথ্য জানিয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপক লোকমান হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই সরকার চাচ্ছে নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার কমে আসুক। এজন্য আমরা কাজ করছি। আমাদের উদ্যোক্তারা কংক্রিটের ব্লক তৈরি এবং বাজারজাত করছেন। নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমরা ব্লকের উদ্যোক্তা তৈরি ও সচেতনা বৃদ্ধি জন্য দেড় শতাধিক মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণাও করা হচ্ছে।’ কোডেক ও প্রকল্পের যৌথ অর্থায়নে মডেল স্থাপনা হিসেবে বাগেরহাট খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজে সলিড ব্লক ব্যবহার করে ৭২০ বর্গফুটের একটি পাঠাগার নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান এ প্রকল্প ব্যবস্থাপক।
সদর উপজেলার তুষার পাল বলেন, ‘আসলে বাগেরহাট খুবই দুর্যোগপূর্ণ এলাকা। তাই এখানে পরিবেশবান্ধব হলো ব্লক, পার্কিং টাইলস তৈরি করছি আমরা। ইটের বিকল্প হিসেবে শহরে-গ্রামে দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগে আসছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এছাড়া সরকার আমাদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ইটের ভাটা বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তাতে আমাদের এ কংক্রিট ব্লকের চাহিদা আরো অনেক বেড়ে যাবে। আমরাও ভালোভাবে উপার্জন করে জীবন-যাপন করতে পারব তখন।’
বাগেরহাটের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোড়া ইটের থেকে কংক্রিট ব্লক অনেক বেশি কার্যকর, ব্যয়সাশ্রয়ী, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। এ কারণে অনেক গ্রামীণ সড়কও ব্লক দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। দিন দিন এ ব্লকের ব্যবহার বাড়ছে।’










