বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ফেরত নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ও মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে তাদের জীবন গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছে মানবাধিকারবিষয়ক আঞ্চলিক জোট আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর)। সংস্থাটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, গতকাল এক অনুষ্ঠানে বক্তব্যে রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার বিষয়ে মন্তব্য করেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর মিয়ানমার প্রাথমিকভাবে মালয়েশিয়ায় থাকা পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে।
তিনি একে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ এবং মালয়েশিয়ায় জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আনোয়ার বলেন, ‘অনেকে বলেন, “তাদের ফেরত পাঠান, ফেরত পাঠান।” কিন্তু কোথায় ফেরত পাঠাব? মিয়ানমার তো তাদের নিতে চাইছিল না। তাই মিয়ানমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা প্রথম ধাপে পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকেও ফেরত নিতে মিয়ানমার নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে। তবে এ প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সূচি জানাননি তিনি।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, আঞ্চলিক শরণার্থী সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে মালয়েশিয়া।
এ ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এপিএইচআর। সংস্থাটি বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে তা তাদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
এপিএইচআরের কো-চেয়ারম্যান এবং মালয়েশিয়ার ক্লাং এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গারা নিপীড়ন, সহিংসতা ও জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছেন। যে সামরিক বাহিনী তাদের দেশছাড়া করেছে, সেই বাহিনী এখনো ক্ষমতায় রয়েছে এবং রাখাইন এখনো সংঘাতপূর্ণ এলাকা। এ অবস্থায় তাদের ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের নন-রিফাউলমেন্ট নীতির লঙ্ঘন হতে পারে।’
নন-রিফাউলমেন্ট আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি, যার অধীনে কাউকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।
এপিএইচআর বলেছে, যাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাদের গ্রহণ করবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী—যে বাহিনী ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতার জন্য দায়ী। বর্তমানে রাখাইনে সশস্ত্র সংঘাত চলছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার নেই এবং বহু মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। ফলে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
এপিএইচআর আরো জানায়, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে এবং সরকার জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রহীনতার শিকার। এসব কারণে তারা প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করে অনেকে পৌঁছে গেছেন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়।










