বেশ কয়েকটি ভিডিওতে হাঁটু গেড়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতেও দেখা গেছে তাদের। তবে সে সময় কে কোথায় দায়িত্বরত ছিলেন, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন এবং কত রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছেন সে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গায়েব করে ফেলা হয়। এ ধরনের তথ্য ছাড়া দায়ী এপিবিএন সদস্যদের চিহ্নিত করা এবং বিচার নিশ্চিত করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ছাত্র-জনতার ওপর গুলির ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় তদন্ত ও বিচার এগোলেও অস্ত্র ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে এপিবিএনের সদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় মাঠে থাকা কয়েকজন সদস্যের নামে অস্ত্র ইস্যু না থাকলেও তারা অন্য সদস্যের অস্ত্র নিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন বলে আদালতে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে কোন সদস্যের হাতে কোন অস্ত্র ছিল, কত রাউন্ড গুলি ইস্যু হয়েছিল এবং গুলিবর্ষণের পর কত রাউন্ড ফেরত দেয়া হয়েছিল—এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য নথি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এপিবিএন সদস্যদের অস্ত্র ও গুলি ব্যবহারের তথ্যসংবলিত প্রয়োজনীয় নথি নষ্ট করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তার মতে, এসব তথ্য গোপনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট এপিবিএন সদস্যদের অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে হত্যার ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, এপিবিএন সদস্যদের অস্ত্র ব্যবহার, গুলি এবং দায়িত্ব পালনের স্থানসংক্রান্ত তথ্য গোপন করতে প্রয়োজনীয় নথি নষ্ট করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজনের নামে বরাদ্দ করা অস্ত্র অন্যজন ব্যবহার করেছেন। এটিও এক ধরনের অপরাধ। বিষয়গুলো আমরা ট্রাইব্যুনালের নজরে এনেছি। এ ধরনের স্পর্শকাতর তথ্য গোপনের চেষ্টা তাদের অপরাধপ্রবণতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে। ভবিষ্যতে কোনো বাহিনী যাতে দায়িত্ব পালন, অস্ত্র বরাদ্দ ও গুলি ব্যবহারের তথ্য গোপন করতে না পারে, সে বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করার জন্যও আমরা বলেছি।’

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, চানখাঁরপুলে ৫ আগস্টের ঘটনায় শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের এপ্রিলে আট পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে ৯০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৭৯ জনের সাক্ষ্য, ১৯টি ভিডিও, ১১টি সংবাদ প্রতিবেদন, দুটি অডিও, বিভিন্ন বই ও প্রতিবেদন এবং ছয়টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, তদন্তের পর মামলাটি বিচারেও গড়ায়। ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পরে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অপর পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর বাইরেও অন্যান্য হত্যাকাণ্ডেও এবিপিএন সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এবিপিএনের তৎকালীন ডিআইজি (প্রশাসন) মোল্লা নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে আছেন। আরো কয়েকজন কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। এসব তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই অস্ত্র ব্যবহারের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে গুলি চালানো কয়েকজন এপিবিএন সদস্যের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না। অথচ ভিডিও ফুটেজে তাদের অস্ত্র হাতে গুলি চালাতে দেখা গেছে। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, তারা অন্য সদস্যদের নামে ইস্যু করা রাইফেল নিয়ে গুলি করেছিলেন।

এর মধ্যে চানখাঁরপুলে দায়িত্ব পালন করা এক পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্যেও অস্ত্র হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা উঠে এসেছে। ওই পুলিশ সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, তার নামে একটি চায়না রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি ইস্যু করা হয়েছিল। তিনি গুলি করতে অস্বীকৃতি জানালে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা তার কাছ থেকে রাইফেল নিয়ে এপিবিএন কনস্টেবল সুজন হোসেনের হাতে দেন। পরে সুজন ওই রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ শুধু অস্ত্র ইস্যু রেজিস্টারে কার নামে কোন রাইফেল ছিল—এ তথ্য দিয়ে ওই দিনের গুলিবর্ষণের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে আসে এপিবিএনের অস্ত্র ব্যবস্থাপনার নথি গায়েবের তথ্য। ৫ আগস্ট কোথায় কতজন এপিবিএন সদস্য মোতায়েন ছিলেন, তাদের মধ্যে কার নামে কোন অস্ত্র ইস্যু হয়েছিল, কত রাউন্ড গুলি দেয়া হয়েছিল, ডিউটি শেষে কত রাউন্ড ফেরত নেয়া হয়েছিল এসব তথ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়নি। কারণ ভিডিও ফুটেজে অস্ত্রধারী সদস্য শনাক্ত করা গেলেও সেই সদস্যের নামে অস্ত্র ইস্যু না থাকলে তার হাতে থাকা অস্ত্রটি কার নামে ছিল, সেটি জানা ছাড়া দায় নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। একই সঙ্গে একটি অস্ত্র একাধিক সদস্য ব্যবহার করলে সেই অস্ত্র থেকে ছোড়া গুলির সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও ব্যালিস্টিক ও নথিগত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ বিষয়ে এপিবিএন প্রধান উপপুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হাসিব আজিজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি গত এপ্রিলে দায়িত্ব নিয়েছি। এরপর যতটুকু দেখেছি জুলাই আন্দোলনে দায়িত্ব পালন করা এপিবিএন সদস্যদের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংগ্রহ করছে। উনারাই প্রয়োজনীয় সব তথ্যপ্রমাণ আদালতের কাছে সরবরাহ করছেন।’

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শুধু ভিডিও ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য যথেষ্ট নয়। অস্ত্র ইস্যু, গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনা, ডিউটি রোস্টার, অস্ত্র হস্তান্তরের তথ্যও একই সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে একজন সদস্যের নামে ইস্যু করা অস্ত্র অন্য সদস্য ব্যবহার করলে প্রকৃত গুলিবর্ষণকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। চানখাঁরপুলের ঘটনায় বিচারিকভাবে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোলেও অস্ত্র ব্যবহারের নথি নিয়ে প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে যাদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না—রাষ্ট্রপক্ষের এ বক্তব্যই প্রমাণ করে, অস্ত্রের হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা না মিললে জবাবদিহির কাঠামো কতটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় এপিবিএনসহ অনেক ইউনিটের কাছেই প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্য নেই। কে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছে, কোন ধরনের অস্ত্র ও কত রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছে—এসব তথ্য সংরক্ষিত না থাকায় দায়ীদের শনাক্ত ও তাদের অপরাধ প্রমাণে বিচার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হবে। এসব তথ্য থাকলে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হতো। এখন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, ভিডিও ফুটেজ এবং তারা যে পরিবহন ব্যবহার করেছে, সেসব সূত্র ধরে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।’