অস্ট্রেলিয়ার সিল ও সি-লায়নদের মধ্যে প্রাণঘাতী এইচ৫ বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। দেশটির দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া অঙ্গরাজ্যে লম্বা নাকের ফার সিলে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে সোমবার (২৪ আগস্ট) জানানো হয়, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষ গত শনিবার জানিয়েছে লাইমস্টোন কোস্টের বিচপোর্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া একটি লম্বা নাকের ফার সিলের শরীরে এইচ৫এন১ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এটিই অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা।

এছাড়া, গতকাল ক্যাঙারু আইল্যান্ডের কাছে পেজেস আইল্যান্ডসে মৃত অবস্থায় পাওয়া আরেকটি লম্বা নাকের ফার সিলেও ভাইরাসটির সংক্রমণের সন্দেহ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সিএসআইআরওর পরীক্ষার ফল এখনো পাওয়া যায়নি।

চার্লস ডারউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তন্যপায়ী প্রাণীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন ওয়াইনারস্কি আশঙ্কা করছেন, ভাইরাসটি দ্রুত আরো সিল ও সি-লায়নের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে এবং তা সংরক্ষণ প্রচেষ্টার জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করবে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান সি-লায়ন নিয়ে তিনি বেশি উদ্বিগ্ন, কারণ এ প্রাণীর সংখ্যা ইতোমধ্যে খুবই কম।

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় সি-লায়নের আবাসস্থলগুলো প্রজননকারী সামুদ্রিক পাখির উপনিবেশের কাছাকাছি হওয়ায় আগামী কয়েক সপ্তাহে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বের অন্য অঞ্চলে এইচ৫এন১ ভাইরাস ইতোমধ্যে সিল ও সি-লায়নসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। দক্ষিণ আমেরিকা ও সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে কয়েকটি প্রজাতির বিপুলসংখ্যক প্রাণী মারা গেছে, বিশেষ করে শাবকদের মধ্যে প্রাণহানি ছিল ব্যাপক।

এর আগে, ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনায় এইচ৫এন১ ভাইরাসে ১৭ হাজারের বেশি সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিলের শাবক মারা যায়। অস্ট্রেলিয়ার হিয়ার্ড আইল্যান্ডেও ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ড্রোন জরিপে ১৩ হাজারের বেশি মৃত সিলের শাবক শনাক্ত হয়েছে।

তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টার্কটিক রোগতত্ত্ববিদ জেন ইয়ংগার বলেন, দক্ষিণ আমেরিকায় সি-লায়ন ও ফার সিলের মধ্যে ব্যাপক সংক্রমণ দেখা গেছে। দক্ষিণ মহাসাগরীয় অঞ্চলেও সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিল ও অ্যান্টার্কটিক ফার সিলের মধ্যে বড় ধরনের প্রাণহানি হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় তিন ধরনের পিনিপেড—লম্বা নাকের ফার সিল, অস্ট্রেলিয়ান ফার সিল এবং বিপন্ন অস্ট্রেলিয়ান সি-লায়ন—প্রজনন করে। দেশটির সরকার তিন প্রজাতিকেই এইচ৫ বার্ড ফ্লুর কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার সি-লায়ন রয়েছে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে সংখ্যাটি ১০ হাজারেরও কম হতে পারে। এদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের আবাস দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায়, বাকিরা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়।

পেজেস আইল্যান্ডসে মৃত সিলটি পাওয়া গেছে এমন একটি এলাকায়, যেখানে সম্প্রতি গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন পাখির ব্যাপক মৃত্যু হয়েছে। দ্বীপগুলো অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় অস্ট্রেলিয়ান সি-লায়ন প্রজননস্থল। ফলে সি-লায়নদের মধ্যেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

ইয়ংগার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সিল ও সি-লায়নরা ভাইরাসটির বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাণহানির মাত্রা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।