ফাইনালের আগে টানা ১০ জয়। এ যেন রূপকথাকেও হার মানানো জয়রথ। রোহিত শর্মার দল প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়ে হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফির সবচেয়ে বড় দাবিদার। ভারতবাসী স্বপ্নে বিভোর ছিল, রোববার আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ মুকুট জিতে নেবেন কোহলিরা। তাতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তিও গড়া হতো। কিন্তু ভাগ্যদেবী তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন হলো না। গতকাল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ছয় উইকেটে পরাজিত হয় স্বাগতিকরা। রোহিত, কোহলিদের স্বপ্নভঙ্গ করে অজিরা জিতে নিল রেকর্ড ষষ্ঠ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শিরোপা।
রোহিত, কোহলিদের বিজয় উৎসব দেখবেন বলে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে হাজির হন এক লাখেরও বেশি দর্শক। কিন্তু কাল ফাইনালে তারা দেখল চাপে ভেঙে পড়া এক ভারতকে। নীল ঢেউ জাগা সেই গ্যালারিতে ম্যাচ শেষে যেন শ্মশানের নীরবতা। বিষাদগ্রস্ত ক্রিকেটারদের মধ্যে চোখের জল মুছতে দেখা গেল মোহাম্মদ সিরাজকে, মাঠেই বসে পড়লেন লোকেশ রাহুল। রোহিত ও কোহলি যেন ভাষাহীন। জসপ্রীত বুমরাহ যেন মানতেই পারছিলেন না। গ্যালারিতে ক্রিকেট তারকাদের স্বজনরাও বাকরুদ্ধ।
মাঠের একদিকে বিষাদ, অন্যদিকে তখন বিশ্বজয়ের উৎসব। কামিন্স, স্টার্ক, হেডরা মেতেছেন দেশকে আরেকবার বিশ্ব মুকুট জেতানোর আনন্দে।
গতকাল প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার আগুনে বোলিংয়ে বিপর্যস্ত হয় ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ। এরপর বোলিং ব্রিগেডকে হতাশ করেন ট্রাভিস হেড ও মার্নুস লাবুশেন। আগে ব্যাটিং করতে নেমে ৫০ ওভারে ২৪০ রানে অলআউট স্বাগতিকরা। পরে হেডের ১৩৭ রানের বীরোচিত সেঞ্চুরিতে ভর করে ৪২ বল হাতে রেখে জয় তুলে নেয় অজিরা।
এর আগে ১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয় করে অস্ট্রেলিয়া। ২০২১ সালে তারা টি২০ বিশ্বকাপও জয় করে। নারীদের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া আরো শক্তিশালী। তারা সাতবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও ছয়বার টি২০ বিশ্বকাপ জয় করেছে। সব মিলিয়ে ২০ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া!
অন্যদিকে, তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরা থাকল ভারতের। তারা ১৯৮৩ ও ২০১১ সালে ওয়ানডে বিশ্ব শিরোপার স্বাদ পায়।
রান তাড়া করতে নেমে মোহাম্মদ শামি ও বুমরাহর আঘাতে ৪৭ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। সাজঘরে ফিরে যান ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল মার্শ ও স্টিভ স্মিথ। তাতে জয়ের আশা দেখতে শুরু করে ভারত। যদিও এরপর দারুণভাবে ফিরে আসে অজিরা। হেড ও লাবুশেন ২১৫ বলে ১৯২ রানের অনবদ্য জুটিতে অস্ট্রেলিয়াকে জেতান। হেড ১২০ বলে ১৩৭ ও লাবুশেন ১১০ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত থাকেন।
অথচ এ দুজনের বিশ্বকাপ খেলাটা বেশ নাটকীয়। লাবুশেন তো বিশ্বকাপ স্কোয়াডেই ছিলেন না। অ্যাস্টন অ্যাগার ইনজুরিতে পড়লে তাকে ডাকা হয়। আবার হেড চোট থেকে সেরে উঠছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় বসে, ততক্ষণে চার চারটি ম্যাচ খেলে ফেলেছে অজিরা। পঞ্চম ম্যাচে সুযোগ পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৯ বলে সেঞ্চুরি করে হন ম্যাচসেরা। ফাইনালেও তিনি জয়ের নায়ক। তার সঙ্গে ৫৮ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপ জেতাতে অমূল্য অবদান রাখলেন লাবুশেন।
প্রতি ম্যাচের মতো গতকালও রোহিত শর্মা ঝড়ো সূচনা এনে দেন ভারতকে। অবশ্য অন্য ম্যাচগুলোর মতো ফাইনালে তার গড়া প্লাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে ইনিংসটা বড় করতে পারেননি সতীর্থরা। পঞ্চম ওভারে শুভমান গিলকে (৪) ফেরান গতিদানব মিচেল স্টার্ক। মিড-অনে অ্যাডাম জাম্পাকে ক্যাচ দেন তিনি।
এরপর কোহলিকে নিয়ে ছুটছিলেন রোহিত। দারুণ ব্যাটিং করা ভারতীয় দলনায়ক দশম ওভারে ৩১ বলে ৪৭ রান করে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের শিকার হন। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা মারেন। পরের বলে চার। এরপর আবার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তুলে মারেন। এবার ক্যাচ ওঠে কাভারে। পেছন দিকে ছুটে ট্রাভিস হেড দুর্দান্ত ক্যাচ নেন।
প্রথম ১০ ওভারে গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ভারত। ১১তম ওভারে শ্রেয়াস আইয়ার মাত্র ৪ রান করে কামিন্সের শিকার হলে বিপদ আরো বাড়ে। পরে বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুল ১০৯ বলে ৬৭ রানের পার্টনারশিপ গড়ে দলকে কিছুটা চাপমুক্ত করেন। যদিও আগের সেই আগ্রাসী ভারতকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। স্টার্ক, কামিন্সের আগুনে বোলিংয়ের সামনে তারা ছিল রীতিমতো অসহায়। কোহলি ৬৩ বলে ৫৪ রান করে কামিন্সের শিকার হন। আর লোকেশ ১০৭ বলে ৬৬ রান করে স্টার্কের বলে জস ইংলিশকে ক্যাচ দেন।
বিপর্যয়ের এ দিনটিতে দশম ওভার শেষ হওয়ার পরের ৯৭ বলে কোনো বাউন্ডারি পায়নি ভারত, যা বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাউন্ডারি-খরা। শ্রীলংকার বিপক্ষে ১২৮ বলে বাউন্ডারি মারতে ব্যর্থ হয় নেদারল্যান্ডস। এর আগে গ্রুপ পর্ব অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৯ বলে বাউন্ডারিহীন ছিল ভারত। প্রতি ম্যাচে চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করা ভারতীয়দের এ বাউন্ডারি-খরা ছিল এ বিশ্বকাপের অচেনা রূপ। তাদের সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হন অজিরা। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম ফাস্ট বোলার হিসেবে ১০ ওভারে একটিও বাউন্ডারি হজম করেননি কামিন্স।
অজি বোলাররা শেষদিকে আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। তাদের বোলিং তোপে এরপর ভারতের আর কোনো ব্যাটারই দাঁড়াতে পারেননি। ধুঁকতে থাকা স্বাগতিকরা শেষ পর্যন্ত ২৪০ রানে গুটিয়ে যায়। স্টার্ক তিনটি এবং হ্যাজেলউড ও কামিন্স দুটি করে উইকেট নেন। নকআউটের দুই ম্যাচে ১৪ গড়ে ছয় উইকেট নিলেন স্টার্ক।
অজি দলনায়ক শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে, দর্শক সমর্থন একপেশেই হবে। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার দর্শক ভারতকে সমর্থন করবে। কিন্তু বিশাল দর্শককে স্তব্ধ করে দিতে চাই আমরা।’
কথা রাখলেন কামিন্স। চলতি আসরে ৭০০ রান করে ইতিহাস গড়া কোহলিকে আউট করে তিনি সত্যি সত্যিই নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন। কেননা কোহলিতেই তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফির স্বপ্ন দেখছিল ভারতবাসী। সেই কোহলি যখন ব্যক্তিগত ৫৪ রানে সাজঘরের পথ ধরলেন, তখন স্টেডিয়ামে পিনপতন নীরবতা। কোহলির প্রস্থানের পর কর্তৃত্ব করে অজি পেসাররা ভারতকে আড়াইশর আগে আটকে দেয়।
প্রথম পাওয়ার প্লেতে ভারত তুলেছে ৮২/২। একটি পর্যায়ে ভারতের রানগড় ৮ থাকলেও অজিদের নিখুঁত লাইন-লেংথে ৩৪ ওভারে তা নেমে আসে ৫-এ। আর তৃতীয় পাওয়ার প্লেতে (৪০.১ থেকে ৫০ ওভার) তারা ৫ উইকেট হারিয়ে তুলেছে মাত্র ৪৩ রান!
গোটা ভারতীয় ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি পার্টনারশিপ হয় কোহলি ও লোকেশের কল্যাণে। এছাড়া রোহিত ও শুভমান ২৬ বলে ৩০, রোহিত ও কোহলি ৩২ বলে ৪৬, জাদেজা ও লোকেশ ৪৪ বলে ৩০ এবং লোকেশ ও সূর্যকুমার ৩৪ বলে ২৫ রান করেন। ২৮ বলে ১৮ রান করে দলকে হতাশ করেন সূর্যকুমার যাদব, যিনি ছিলেন শেষ দিকে দলের একমাত্র ভরসা।
ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৭৬৫ রান করেছেন বিরাট কোহলি, আর সর্বোচ্চ ২৪ উইকেট শিকার করেন মোহাম্মদ শামি। অথচ ব্যাট-বলের দুই রাজাই ফাইনালে পরাজিত দলে!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ৫০ ওভারে ২৪০ (লোকেশ ৬৬, কোহলি ৫৪, রোহিত ৪৭; স্টার্ক ৩/৫৫, কামিন্স ২/৩৪, হ্যাজেলউড ২/৬০)। অস্ট্রেলিয়া: ৪৩ ওভারে ২৪১/৪ (হেড ১৩৭, লাবুশেন ৫৮; বুমরাহ ২/৪৩, সিরাজ ১/৪৫, শামি ১/৪৭)। ফল: অস্ট্রেলিয়া ছয় উইকেটে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: ট্রাভিস হেড (অস্ট্রেলিয়া)। প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট: বিরাট কোহলি (ভারত)।










