আমরা যখন একটি স্মার্ট সিটির কথা ভাবি, তখন প্রথমেই আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং এআই-নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা সামনে আসে। বহু বছরের ভোগান্তির পর ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, আমরা হয়তো ধীরে ধীরে একটি স্মার্ট সিটির দিকে এগোচ্ছি। এখনই সিঙ্গাপুর বা টোকিওর পর্যায়ে না পৌঁছলেও কিছু অগ্রগতি অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বাসযোগ্যতার সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অর্থাৎ স্মার্ট ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই কোনো শহর আধুনিক বা স্মার্ট হয় না। এজন্য অধিবাসীদের খরচ সাশ্রয়, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নগর প্রসারের কারণে গত ১০-২০ বছরে ঢাকায় জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকায় মানুষের ঢাকায় আসা থামানো যাচ্ছে না। স্মার্ট তো দূরের কথা, আমরা কি এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারছি?

ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে। একটি অংশ বস্তিতেও বসবাস করে, যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। নগরের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় উন্নয়ন করলেই তার সুফল পুরো শহরে পৌঁছবে না। মেট্রোরেলের সুফল আমরা পাচ্ছি। কিন্তু এতে কি পুরো ঢাকার যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে? এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে শহরে যানবাহনের গতি কতটা বেড়েছে—সেটিও বিবেচনার বিষয়। আমরা এখনো এমন শহরে বাস করছি, যেখানে এক রাতের বৃষ্টিতেই পরদিন নগর জীবন অচল হয়ে পড়ে। এসব সমস্যা সমাধান করতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যারা আবাসন ও নগর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন, সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

আবাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্রয়ক্ষমতা। মানুষের আয়ের তুলনায় বাড়ি বা সম্পত্তির দাম বৃদ্ধি নিজস্ব আবাসন নিশ্চিত করার অন্যতম বড় বাধা। একসময় বাংলাদেশে মর্টগেজ-জিডিপি অনুপাত ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। কিন্তু জিডিপির আকার বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন ঋণ না বাড়ায় এ অনুপাত এখন ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনায় দেখা যায়, ২০১০ সালেও সেখানে এটা ৫ শতাংশের নিচে ছিল, যেটা এখন প্রায় ১৩ শতাংশ। ২০১৫ সালেও এটা ৮ শতাংশের নিচে ছিল।

সব মানুষ নিজস্ব সঞ্চয়ে আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারবে না। সেখানে হাউজিং ফাইন্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তবে ঋণ দিতে হবে দায়িত্বশীলভাবে। মানুষের সামর্থ্যের বাইরে ঋণ দিলে একসময় তা পরিশোধ করা কঠিন হবে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বাড়বে এবং ঋণগ্রহীতাও বিপদে পড়বেন। তাই আবাসনকে কীভাবে আরো সাশ্রয়ী করা যায়, সেটিই মূল প্রশ্ন। ভারতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তারা কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে; এর মধ্যে অন্যতম পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতেও এ ধরনের উদ্যোগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

আমাদের সরকারি সংস্থাগুলোর প্রচুর জমি আছে। অন্যদিকে ডেভেলপারদের একটি প্রকল্পের খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় ভূমি অধিগ্রহণে। অনেক ক্ষেত্রে তারা জমির মালিককে সরাসরি ৫০ শতাংশ ফ্ল্যাট দেয়ার পাশাপাশি সাইনিং মানি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বহন করেন। এখন সরকারি জমিগুলো চিহ্নিত করে যদি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় আবাসন প্রকল্প করা যায় এবং সরকার এর বিনিময়ে ৩০-৩৫ শতাংশ ফ্ল্যাটের মালিক হয়, তাহলে সেই ফ্ল্যাট সরকারি কর্মচারী বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ, ভাড়া কিংবা বিক্রি করা যেতে পারে। এতে সরকার কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ আবাসন সুবিধা পেতে পারে।