বর্তমানে বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রধান উদ্বেগের বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ুতে ক্রমে দূষিত কার্বন ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী বাড়ছে উষ্ণায়ন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য অপরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিশেষ করে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এর পরও বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কয়লার চাহিদা। বিশেষ করে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, চলতি বছর বিদ্যুতের বৈশ্বিক চাহিদা ৫ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ চাহিদার প্রায় অর্ধেকই পূরণ করবে জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে কয়লা। ফলে আগামী বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে কার্বন নিঃসরণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে আইইএ জানায়, বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা ও ব্যবহার অতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে তা এ বছরের বৈশ্বিক বিদ্যুতের চাহিদায় সাড়া দিতে সক্ষম হবে না। ফলে বাড়বে বিদ্যুৎ খাতে কয়লার ব্যবহার।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য জলবায়ু দূষণ রোধ করা। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে কয়লা এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা ও ব্যবহার এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছর বিদ্যুতের বৈশ্বিক চাহিদার ৪৫ শতাংশই পূরণ করবে জীবাশ্ম জ্বালানি। আগামী বছর এ হার দাঁড়াবে ৪০ শতাংশে। পরমাণু বিদ্যুৎ বাকি চাহিদা পূরণ করবে। ফলে ২০১৯ ও ২০২০ সালে বিদ্যুৎ খাতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাস পেলেও চলতি বছর তা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আইইএ। আগামী বছর এটি ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইলেকট্রিসিটি মার্কেট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছর এটি ৩ শতাংশ বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছবে। গত বছর গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে চলতি বছর তা ১ শতাংশ এবং আগামী বছর ২ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয়-এশিয়া অঞ্চলে গ্যাসের তুলনায় কয়লার চাহিদা বেশি। ফলে এ অঞ্চলের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে কয়লা খাত বড় ভূমিকা রাখছে।
ব্রিটিশ বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি বিপি এক প্রতিবেদনে জানায়, আগামী বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কয়লার চাহিদা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছবে। এশিয়ার দেশগুলোতে কয়লার ঊর্ধ্বমুখী ব্যবহার চাহিদা বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীন ও এশিয়ার অন্য দেশগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। যেখানে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে সেখানে চীনে বেড়েছে ১ শতাংশ। প্রতি বছর বিশ্বেজুড়ে যে পরিমাণ কয়লা ব্যবহূত হয় তার অর্ধেকই ব্যবহার করে চীন। এদিকে শুধু চীন নয়, বরং মালয়েশিয়াতেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার হু হু করে বাড়ছে। গত বছর দেশটির কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত আছে। এছাড়া ভিয়েতনামে কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ ও ইন্দোনেশিয়ায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
আইইএর দেয়া তথ্যমতে, গত বছর করোনা মহামারীর প্রভাবে বিদ্যুতের বৈশ্বিক চাহিদা ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। বর্তমানে মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটছে। ফলে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। চলতি বছর বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ৫ শতাংশ এবং আগামী বছর ৪ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ চাহিদার বেশির ভাগই আসবে প্রশান্ত মহাসাগরীয়-এশিয়া অঞ্চল থেকে।










