সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রেতারা গমের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাজারের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার চলমান সংকটের ফলে নিরাপদ বাজার হিসেবে দেশটির প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্লাটস।

মিসরের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়ার ময়দা উৎপাদকরা সাধারণত ব্ল্যাক সি অঞ্চলের শস্যের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে বছরের দ্বিতীয়ার্ধের চাহিদা পূরণের জন্য দেশটির উৎপাদকরা ইউক্রেনের ১১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিন গমের ওপর নির্ভরশীল। ব্ল্যাক সি অঞ্চলে ক্রমাগত সামরিক উত্তেজনা এসব দ্বিতীয়ার্ধের ক্রেতাদের অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ঝুঁকতে আগ্রহী করে তুলছে। যেকোনো সময় ইউক্রেন সংকট সংঘাতে রূপ নিতে পারে এ আশঙ্কা থেকে ব্যবসায়ীদের বিকল্প বাজারের উৎসের সন্ধানে এমনটা ঘটছে।

অস্ট্রেলিয়ার এক ব্যবসায়ী বলেন, গত জুলাই থেকেই ক্রেতাদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার গম একটি নিরাপদ উৎস হিসেবে গণ্য হতে শুরু করেছে।

মূলত গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্ল্যাক সি অঞ্চলের গমের বাজার স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছিল। এ সময় শস্য রফতানির ওপর রাশিয়ান সরকারের করারোপ আমদানিকারকদের বিকল্প বাজার খুঁজতে উৎসাহিত করে। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ফ্রি-অন-বোর্ড (এফওবি) মার্কেটে এগিয়ে থাকতে অনীহা দেখাচ্ছে অধিকাংশ ব্যবসায়ী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সংকট মূলত এক বছর আগে শুরু হওয়া বাজার পরিবর্তনের আচরণকে প্রসারিত করেছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যের পরও ইউরোপীয় দেশ দুটির ব্যবসায়িক অংশীদাররা শস্যের জাহাজীকরণ প্রবাহ চলমান রেখেছে। দেশ দুটির বাজারসংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বলছেন, অনেক গ্রাহকই ব্ল্যাক সি অঞ্চলের বাজার থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা থেকে বিরত থেকেছে। বিপরীতে এসব ক্রেতারা বাজারটিতে তাদের অংশগ্রহণ কমিয়ে আনছে।

এক ব্যবসায়ী জানান, ব্ল্যাক সি অঞ্চলের বাজার এখনো সক্রিয় আছে এবং এফওবি মার্কেট বর্তমানে চলমান। তবে কিছু বহুজাতিক করপোরেশন জানায়, তারা ইউক্রেনের গম বাজারজাত করার পরিমাণ কমিয়ে আনার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, অঞ্চলটিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

এদিকে এ সংকটের সুযোগে অস্ট্রেলিয়ার সরবরাহকারীরা ব্ল্যাক সি অঞ্চলের নতুন শস্যের বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। চলতি বিপণন মৌসুমে দেশটি ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নিজেদের রফতানি কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

অন্যদিকে ক্রেতাদের উদ্বেগের ফলে অস্ট্রেলিয়ার লজিস্টিকস-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বেড়ে চলছে। ফলে আগামী দু-তিন মাসে জাহাজীকরণ সময়সূচি বেশ কঠিন হয়ে উঠছে। এ সময়ে এশিয়া অঞ্চলের ক্রেতারা অন্যান্য বাজার থেকে সরবরাহ প্রতিযোগিতার বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার বাজার থেকে সরবরাহ চাহিদা পূরণের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠছে।

গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বরে পঞ্চম বৃহৎ গম রফতানিকারক দেশটি ৫৩ লাখ টনের বেশি গম রফতানি করেছে, যা ২০২০-২১ বিপণন মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি। পূর্ববর্তী মৌসুমের চেয়ে একটি বড় ধরনের উৎপাদন পরিমাণ রফতানিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে। চলতি মৌসুমে ২ কোটি ৪০ লাখ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ টন গম রফতানি করবে বলে আশা করছে অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ টন গমের ক্রয়াদেশ দিয়ে রেখেছে চীন। চলতি মৌসুমে চীন দেশটির গমের একটি বড় ক্রেতা হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বরে দেশটি থেকে চীনের গম আমদানির পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ টন। চীনের এ বিপুল চাহিদা এশিয়ার অন্য ক্রেতাদের চিন্তার মধ্যে রেখেছে। অনেক ক্রেতাই সরবরাহ সংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কায় অস্ট্রেলীয় গমের অগ্রিম সরবরাহ আদেশ দিয়ে রেখেছে।