চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতের কারণে ব্যাহত হচ্ছে জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া। অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে বাড়াতে পারছে না বেইজিং, যার প্রভাব পড়েছে রফতানিনির্ভর জাপানের শিল্প খাতে। ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) সিদ্ধান্ত গ্রহণে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকগুলোর একটি। ব্যাংকটির আগামী নীতিনির্ধারণী সভায় চীনকেই রাখা হবে আলোচনার কেন্দ্রে। খবর রয়টার্স।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপান সরকারের ঊর্ধ্বতন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চীনে এখন যা ঘটছে, তা জাপানের জন্য উদ্বেগজনক। জাপানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা নিয়ে আসতে পারে বিষয়টি। চীনে চাহিদার নিম্নগতির অর্থ জাপানের রফতানি কমিয়ে দেবে, যার প্রভাব পড়বে মজুরি বৃদ্ধি খাতে। পরবর্তী সময়ে মুদ্রানীতিতে বিষয়টি ভূমিকা রাখবে। চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে হতাশা বাড়ছে জাপানে। দেশটির সরকার তার মাসিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে চীন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘চীনের গল্পে ইতি ঘটেছে। চীন আর ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’
জুলাইয়ে ব্যাংক অব জাপান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কিছু নীতিমালা গ্রহণ করে। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, ২১-২২ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী মিটিংয়ে ব্যাংক অব জাপান সুদহার বাড়াবে না। তবে নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখনো চীনের পরবর্তী পরিস্থিতির অপেক্ষায়।
চীন জাপানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। জাপানের রফতানি বাণিজ্যের ২০ শতাংশ হিস্যাই চীনের। ২০২০ সালে দেশটি বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনে রফতানি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ পতন ঘটেছে। চীনের বাজারে গাড়ি, ইস্পাত ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাপানের রফতানি। অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, চীনের অর্থনৈতিক অস্থিরতা জাপানের প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে। এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশে মন্দাবস্থা অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করবে। চীন ও জাপান যৌথভাবে বৈশ্বিক জিডিপির ৫ শতাংশ জিডিপি ধারণ করে।
এদিকে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও চীন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। অনেক প্রতিষ্ঠানই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ নির্মাণযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কোমাতসু চীনে তাদের বেশকিছু কার্যক্রম সংকুচিত করে নিয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিরোয়ুকি ওগাওয়া দাবি করেছেন, উৎপাদন কমানোর প্রধান কারণ চীনের চাহিদা কমে যাওয়া। কূটনৈতিক টানাপড়েনও একটা বড় কারণ। জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয় পানি প্রশান্ত মহাসাগরে ছাড়া হয়, যা নিয়ে উদ্বেগ জানায় চীন। জাপানের সব ধরনের সি ফুড আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ টানাপড়েন স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত করছে জাপানের অর্থনীতিকে। পাশাপাশি রয়েছে চীননির্ভর পর্যটন ও পরিষেবা খাত। এর মধ্যেই জাপানের পর্যটন খাতে চীনা পর্যটকদের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
জাপানের প্রকৃত মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৬তম মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ব্যাংক অব জাপানের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের চেয়ে বেশি। ব্যাংক অব জাপান দ্রুত কোনো পরিবর্তনের ব্যাপারে সংকেত দেয়নি। বিওজের গভর্নর কাজুও ওয়েদা বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মজুরি বৃদ্ধি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান, যা প্রভাব ফেলবে ভোক্তা মূল্যস্ফীতিতে। তবে চীনে চাহিদা কমে যাওয়ায় জাপানের শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমের নিম্নগতি দীর্ঘ হতে পারে। আয় কমে যাওয়ায় জাপানের কোম্পানিগুলো হয়তো মজুরি বাড়াতে স্বীকৃত হবে না। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগ ও বেকারত্বের হারও বিবেচনার বিষয়, যা মূল্যস্ফীতি ঘনীভূত করে তুলতে পারে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। জাপানের গৃহস্থালি ব্যয় দুই বছরে সর্বনিম্নে নেমেছে জুলাইয়ে। চীনের দুর্বল অর্থনৈতিক গতি থাকা অবস্থায় জাপান তার মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে রাখার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। জাপানের জন্য সেটাই এখন প্রধান বিবেচ্য।










