নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে দেশে বাড়ছে খাদ্যশস্যের চাহিদা ও ব্যবহার। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ক্রমে বাড়ছে উৎপাদনও। তবে রেকর্ড সর্বোচ্চ উৎপাদন সত্ত্বেও বৈশ্বিক মজুদে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিলের (আইজিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মজুদ কমে ছয় বছরের সর্বনিম্নে নেমে আসতে পারে। আইজিসির সর্বশেষ খাদ্যশস্যের বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুনে খাদ্যশস্যের ২০২০-২১ বিপণন মৌসুম শেষ হয়েছে। এ মৌসুমে বৈশ্বিক উৎপাদন সব মিলিয়ে ২২১ কোটি ৬০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ। ২০২১-২২ মৌসুমের উৎপাদন এই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে। এ সময় বিশ্বব্যাপী ২৩০ কোটি ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে।

ওয়ার্ল্ডগ্রেইনডটকম এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২১-২২ মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে চীন। এ সময় দেশটির ভুট্টা উৎপাদন রেকর্ড সর্বোচ্চ বাড়বে। তবে ব্যবহারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রেকর্ড সর্বোচ্চ উৎপাদন সত্ত্বেও মজুদ পরিস্থিতি সংকুচিত করে তুলছে।

আইজিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২০-২১ মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মজুদ এর আগের মৌসুমের তুলনায় কমে ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টনে নেমেছে। ২০২১-২২ মৌসুমে মজুদ কিছুটা বেড়ে ৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকবে ২০ লাখ টন। কিছুটা বাড়লেও এটিই হবে গত ছয় মৌসুমের সর্বনিম্ন মজুদ। এর আগে ২০১৬-১৭ বিপণন মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মজুদ সর্বশেষ ৫৯ কোটি ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ৬৬ কোটি ২২ লাখ টনে উন্নীত হয়েছিল। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে মজুদ।

আইজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদায়ী মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৩ কোটি ৭০ লাখ টনে। সে হিসাবে উৎপাদনের তুলনায় ব্যবহারের পরিমাণ ২ কোটি ১০ লাখ টন বেশি। অন্যদিকে ২০২১-২২ মৌসুমে খাদ্যশস্যের ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ২২৯ কোটি ৯০ লাখ টনে। উৎপাদনের তুলনায় ব্যবহারের পরিমাণ ২০ লাখ টন বেশি। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবহার ও উৎপাদনের পরিমাণে এমন ব্যবধান আগামীতে খাদ্যশস্যের মজুদ খাতে অশনিসংকেত বয়ে আনছে।

আইজিসির প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ২০১৯-২০ মৌসুমে বিশ্ববাজারে লেনদেন হয়েছে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টন খাদ্যশস্য। বিদায়ী মৌসুমে বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪২ কোটি ৫০ লাখ টনে উন্নীত হয়। তবে ২০২১-২২ মৌসুমের প্রাক্কলন অনুযায়ী বাণিজ্যের পরিমাণ কমে ৪১ কোটি ৮০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঊর্ধ্বমুখী রাখতে জ্বালানি জোগাবে নিকট-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল। ২০২১-২২ মৌসুমে অঞ্চলটির দেশগুলো সর্বাধিক খাদ্যশস্য আমদানি করবে।

সর্বশেষ আইজিসি প্রতিবেদনে প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন, ব্যবহার, বাণিজ্য ও মজুদসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২০-২১ মৌসুমে বিশ্বব্যাপী সব মিলিয়ে ৭৭ কোটি ৩০ লাখ টন গম উৎপাদিত হয়। ২০২১-২২ মৌসুমে উৎপাদন বেড়ে ৭৮ কোটি ৯০ লাখ টনে উন্নীত হবে। বিদায়ী মৌসুমে উৎপাদিত ভুট্টার পরিমাণ ১১৩ কোটি ১০ লাখ টন। ২০২১-২২ মৌসুমে এটি বেড়ে ১২০ কোটি ১০ লাখ টনে উন্নীত হবে।

সর্বশেষ মৌসুমে ৫০ কোটি ৪০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। ২০২১-২২ মৌসুমে এটি বেড়ে ৫১ কোটি ২০ লাখ টনে উন্নীত হবে। এদিকে সয়াবিন উৎপাদন ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৩৮ কোটি ৩০ লাখ টনে উন্নীত হবে। তবে এসব শস্যের প্রতিটিরই মজুদ কমবে।