শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে যেকোনো দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশে এ ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। অপুষ্টি, শিক্ষার মানের অবনতি, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলিয়ে মানবসম্পদ গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এসব দেশে। এর ফল শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা, আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
বহুপক্ষীয় আর্থিক সংস্থাটির বিশদ প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল বহু দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানের অবনতি ঘটছে। মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগে ঘাটতি থাকলে সদ্য জন্ম নেয়া প্রজন্ম তাদের সম্ভাব্য আয়ের বড় অংশ হারাতে পারে।
সংকলিত তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২৫ সালের মধ্যে ১২৯টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে ৮৬টিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা অথবা কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শেখার ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে।
‘বিল্ডিং হিউম্যান ক্যাপিটাল হোয়্যার ইট ম্যাটার্স’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিবার, আশপাশের পরিবেশ ও কর্মস্থলে উন্নয়ন ঘটাতে সরকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিবেদনে মানবসম্পদ কাঠামোর অবনতির সঙ্গে ভবিষ্যতের আয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, মানবসম্পদের মান যদি একই আয়স্তরের সেরা দেশগুলোর মতো হতো, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুরা বড় হয়ে সারা জীবনে গড়ে ৫১ শতাংশ বেশি আয় করতে পারত।
বিশ্বব্যাংকের মানব উন্নয়নবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মামতা মূর্তি বলেন, ‘মানবসম্পদ গড়ে তোলা ও সুরক্ষার সক্ষমতার ওপর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সমৃদ্ধি নির্ভর করে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক দেশ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির পুষ্টি, শিক্ষা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনীতিতে টেকসই কর্মসংস্থানের ধরন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।’
এমন উদ্বেগজনক অবনতির প্রমাণ হলো সাব-সাহারা আফ্রিকার কয়েকটি দেশ, যেখানে গড় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উচ্চতা ২৫ বছর আগের তুলনায় কম। এটি স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়, যা সামগ্রিকভাবে আয়ের হারকে প্রভাবিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের উচ্চতা শুধু জিনগত বিষয় নয়। শৈশবে প্রাপ্ত পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রমণ, জীবনযাত্রার মানের ওপরও নির্ভর করে। যদি একটি প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে খাটো হয়, তাহলে সেটি ইঙ্গিত দেয় যে তারা ছোটবেলায় যথেষ্ট পুষ্টি বা স্বাস্থ্যসেবা পায়নি।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ১৫ বছর আগের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের শিশুরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সাব-সাহারা আফ্রিকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।
১৪০ পৃষ্ঠার এ বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে মানবসম্পদকে প্রভাবিত করে এমন কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এতে প্রভাব হিসেবে এসেছে বিস্তৃত পরিসর। শৈশবের অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতি থেকে শুরু করে স্থানীয় অপরাধী চক্রের উপস্থিতি পর্যন্ত গবেষণায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো পরিবার শিশুদের লালন-পালনে কী ধরনের ভূমিকা রাখে তাও ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংক চীনের কয়েক লাখ শিশুর কথা উল্লেখ করেছে, বাবা-মা কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে যাওয়ায় আত্মীয়স্বজনের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে যারা। গবেষণায় দেখা গেছে, ‘পিছিয়ে পড়া এসব’ শিশু তুলনামূলক বেশি আয়সম্পন্ন পরিবারে বড় হলেও গণিত ও ভাষাগত দক্ষতায় খারাপ ফল করে এবং তাদের মধ্যে বিষণ্নতার হার বেশি।
স্থানীয় অপরাধপ্রবণতাও শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সান সালভেদরে গ্যাং-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সম্পদ, আয় ও শিক্ষাগত অর্জন মাত্র ৫০ মিটার দূরে বসবাসকারী মানুষের তুলনায়ও কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ৪০ শতাংশ নারী কোনো কাজেই যুক্ত নন। যারা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত আছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষি, নিম্নমানের আত্মকর্মসংস্থান বা ক্ষুদ্র আকারের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা কর্মস্থলভিত্তিক শেখার সুযোগ খুবই সীমিত।
বিশ্বব্যাংক আরো বলছে, একই আয়স্তরের দেশগুলোর মধ্যেও মানবসম্পদ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পার্থক্য থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে জ্যামাইকা, কেনিয়া, কিরগিজস্তান ও ভিয়েতনামের কথা এসেছে। এসব দেশে একই আয়স্তরের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন সাফল্য পেয়েছে।
এসব ঘাটতি পূরণে প্রতিবেদনে বিস্তৃত পরিসরে নীতিগত সুপারিশ দেয়া হয়েছে। অভিভাবক সহায়তা কর্মসূচি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে শিক্ষানবিশ কাজে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা তৈরি পর্যন্ত এতে অন্তর্ভুক্ত।
নতুন এ প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংকের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিদেশী সাহায্য কমিয়ে এনেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে অর্থসংস্থান ও মানব উন্নয়ন বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে হচ্ছে। যেমন সরাসরি সাহায্য দেয়ার বদলে এমন বিনিয়োগ ও নীতিসহায়তা দেয়া, যা মানুষকে কাজ দেবে, আয় বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।










