দেশে গত ৩০ এপ্রিল লবণ উৎপাদনের ২০১৯-২০ মৌসুম শেষ হয়েছে। এ মৌসুমে সব মিলিয়ে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মৌসুম শেষে লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ টন কম লবণ উৎপাদন হয়েছে। মূলত নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের জের ধরে দাম কমতির দিকে থাকায় মৌসুম শেষে আগেই অনেক চাষী লোকসানের মুখে লবণ চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে এবার আগাম বর্ষায় লবণের প্রস্তুত মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে মৌসুম শেষ হলেও লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে রয়েছেন দেশের চাষীরা। ফলে আগামী দিনগুলোয় দেশে লবণের দাম নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

গত এক দশক ধরে প্রতি মৌসুমেই লবণ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে আসছেন দেশের চাষীরা। তবে এবার মৌসুম শেষে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৮৩ হাজার টন। এরপর ৯ এপ্রিল তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টনে। গত মৌসুমে চাষীরা ১৫ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন করতে পেরেছিলেন। উৎপাদন হয়েছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার টন লবণ, যা লক্ষ্যের তুলনায় বেশি। এবার অনেক আগেই উৎপাদন কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়েছে।

কক্সবাজারের লবণচাষীরা জানান, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে কয়েক বছরের ব্যবধানে লবণের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলে মার্চের শেষ দিকে মাঠ থেকে উঠে যান অনেক কৃষক। দাম বৃদ্ধির আশায় অনেকে খোলা মাঠে লবণ মজুদ করলেও বর্ষা মৌসুম চলে আসায় মাটির নিচে লবণ রাখার সময় চলে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লবণ মজুদের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি উৎপাদিত লবণে অন্তত ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হয়। আগে কম দামে লবণ বিক্রি করায় লোকসানে থাকা কৃষকের কাছে এখন আর নগদ অর্থ নেই। একই সঙ্গে দাম কমে যাওয়ায় বাকিতে বিক্রি করা লবণের দাম তুলতে না পারায় চাইলেও দীর্ঘমেয়াদে পণ্যটি মজুদ করতে পারছেন না কক্সবাজারের প্রায় ২৮ হাজার লবণচাষী। এসব কারণে চলতি বছর দেশে উৎপাদিত লবণের চাহিদা-সরবরাহের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দেশে নিবন্ধিত লবণচাষীর সংখ্যা ৩০ হাজার ৬০০ জন হলেও চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ২৭ হাজার ৭৭২ জন। দেশীয় কৃষকদের উৎপাদিত লবণের পুরোটাই অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহার হয়। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার নতুন বাজার এলাকার লবণচাষী মো. আবু বকর। বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এবারের মৌসুমে ২৫০ কানি জমিতে লবণ চাষ করেছিলাম। কানিপ্রতি খরচ হয়েছে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। কানিপ্রতি ১২০ মণের (প্রতি মণ ৪০ কেজি) মতো লবণ উৎপাদনও হয়েছে। তবে দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় লবণ বিক্রি করতে পারছি না। কানিপ্রতি মাত্র ১০-১২ হাজার টাকা উঠে এসেছে। এখনো আর্থিক লোকসানের আশঙ্কা প্রবল। জমতে শুরু করেছে শ্রমিকদের মজুরিও।

বিসিক, লবণচাষী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে লবণের (অপরিশোধিত) দাম নেমে এসেছে মণপ্রতি (৪০ কেজি) ১৪০-১৪৫ টাকায়। যদিও বিসিকের হিসাবে গড় দাম হচ্ছে ১৫৩ টাকা। অথচ প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২০০ টাকা। চলমান নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়া, যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং কারখানা থেকে লবণের চাহিদা কমে যাওয়ায় দামে অস্বাভাবিক পতন হয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাপারীরা লবণ কিনলেও চাষীদের নগদ টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। সংকটে পড়েছে পুরো খাত।

সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, চলমান নভেল করোনাভাইরাস সংকটে চাষীরা লবণের ভালো দাম পাচ্ছেন না। দুই সপ্তাহ ধরে বৃষ্টির কারণে ৯ মে পর্যন্ত উৎপাদন ঘাটতি রয়েছে প্রায় দেড় লাখ টন। আমরা ৩১ মে পর্যন্ত উৎপাদন ধরে রাখতে কাজ করছি। সেক্ষেত্রে আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। টানা ১২-১৫ দিন বৃষ্টি না হলে ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রতি সপ্তাহেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে চলতি বছর ঘাটতি কাটানো সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন চাষীরা। তাদের মতে, মার্চেই অধিকাংশ চাষী মাঠ ছেড়ে উঠে গেছেন। এপ্রিলে বৃষ্টি শুরু হলে অনেকের প্রস্তুত মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। লবণের দাম কম হওয়ায় বিক্রি করে লোকসান হবে ভেবে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। সামনে ঈদের কারণে শ্রমিক সংকট থাকবে। সব মিলিয়ে এবার দেশের লবণচাষীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।

সম্ভাব্য সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে তা থেকে উত্তরণে এরই মধ্যে বিসিকের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। কৃষকদের প্রণোদনার জন্য মার্চেই ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এজন্য একরপ্রতি ৫৮ হাজার টাকা করে প্রণোদনার প্রস্তাব দেয়া হয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্যারিফ কমিশন যাতে লবণের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে, সে বিষয়েও একাধিক চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে এখনো এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেলে দেশে শিল্প লবণের নামে সোডিয়াম সালফেটের অবাধ প্রবেশ শুরু হবে। এতে দেশীয় খাতটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লবণ চাষের ওপর নির্ভরশীল লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে পড়তে পারে। আমরা আশা করছি, অচিরেই কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা আসবে।

উল্লেখ্য, দেশে প্রতি বছর ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের মৌসুম চলে। তবে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে অনানুষ্ঠানিকভাবে মৌসুম মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। কক্সবাজারের পাঁচটি উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় দেশীয় লবণ চাষ হয়। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের এসব এলাকা থেকে অপরিশোধিত লবণ সংগ্রহ করে মিলাররা তাতে আয়োডিন মেশান। এরপর সারা দেশের বাজারে মোড়কজাত এসব লবণ বিক্রি হয়।