বৈশ্বিক ধনকুবেরদের মাঝে বিলাসবহুল ইয়ট, প্রাইভেট জেট ও দূষণকারী শিল্পে বিনিয়োগের প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে। তাদের ব্যক্তিগত খরচ প্রাক-শিল্পযুগ-পরবর্তী উষ্ণায়ন বৃদ্ধিকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার বৈশ্বিক লক্ষ্য কঠিন করে তুলছে। অক্সফামের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, বিশ্বের ৫০ বিলিয়নেয়ার ৩ ঘণ্টার কম সময়ে একজন ব্রিটিশ ব্যক্তির সমগ্র জীবনকালের তুলনায় বেশি কার্বন নিঃসরণ করেন। খবর গার্ডিয়ান।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অকাল মৃত্যুকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ। পৃথিবীর সব মানুষ যদি বিলিয়নেয়ারদের মতো একই হারে নিঃসরণ বাড়ায়, তাহলে দুদিনের কম সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। অন্যদিকে বর্তমান হারে কার্বন নিঃসরণ হলে ওই সীমা অতিক্রম হতে চার বছর সময় লাগবে।

যুক্তরাজ্যে বাজেট, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও আজারবাইজানের বাকুতে কপ২৯ জলবায়ু সম্মেলনের আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করল অক্সফাম। সেখানে অতিধনীদের ভোগ কমাতে কর প্রস্তাব, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর ও উষ্ণায়নে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অক্সফামের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ৫০ বিলিয়নেয়ার ৩ ঘণ্টার কম সময়ে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেন তা একজন সাধারণ ব্রিটিশের সমগ্র জীবনের চেয়ে বেশি। এ ধনীরা বছরে গড়ে ১৮৪ বার ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করেন, তারা আকাশে থাকেন ৪২৫ ঘণ্টা। এসব ভ্রমণ যতটা কার্বন তৈরি করে একজন সাধারণ মানুষ ৩০০ বছরে সে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে। তাদের বিলাসবহুল ইয়টগুলো গড় মানুষের ৮৬০ বছরের সমতুল্য কার্বন নিঃসরণ করে।

সুনির্দিষ্টভাবে উদাহরণ দিয়েও বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের দুটি প্রাইভেট জেট ১২ মাসের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন আকাশে কাটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের একজন কর্মী ২০৭ বছরে যতটা কার্বন নিঃসরণ করবে, ততটুকু কার্বন ছেড়েছে এ দুটি জেট। অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ও টেসলার সিইও ইলোন মাস্কের দুটি জেট যৌথভাবে একজন ব্যক্তির ৮৩৪ বছরের সমান কার্বন নিঃসরণ করে। ওয়ালমার্ট রিটেইল চেইনের মালিক ওয়ালটন পরিবারের তিনটি ইয়ট বছরে ১৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ করে, যা ১ হাজার ৭১৪ ওয়ালমার্ট কর্মীর কার্বন নিঃসরণের সমান।

যুক্তরাজ্যে আজ ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি সরকার প্রথম বাজেট প্রস্তাব করবে। এর আগেই দেশটির চ্যান্সেলর রাচেল রিভসকে প্রাইভেট জেট ও সুপারইয়ট থেকে শুরু করে ‘জলবায়ু-দূষণকারী মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের’ ওপর ট্যাক্স বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে অক্সফাম। এর জবাবে যুক্তরাজ্যের অর্থ বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, তারা সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া কর বাড়ানোর জল্পনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।

অক্সফাম গবেষকরা ইয়ট থেকে কার্বন নিঃসরণ পরিমাণে একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এতে জাহাজের আকার, ইঞ্জিনের বৈশিষ্ট্য, জ্বালানির ধরন, সমুদ্রে থাকার সময়কাল এবং এমনকি গরম পানির জন্য জেনারেটর ও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ডাটা বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক অ্যালেক্স মেটল্যান্ড বলেন, ‘একটি বড় আবিষ্কার হলো সুপারইয়ট সবচেয়ে দূষিত বিলাসী খেলনা, একজন বিলিয়নেয়ার যার মালিক হতে পারে, রকেটের পরই এর অবস্থান।’

অতিধনীদের বিনিয়োগ থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ এখনো অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক, যা তাদের ইয়ট ও জেট থেকে ৩০৪ গুণ বেশি। গড় হিসাবে ৫০ বিলিয়নেয়ারের কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান পুঁজিবাজারে মোট বিনিয়োগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দূষণ সৃষ্টিকারী। তাদের মালিকানার প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি তেল, খনি, শিপিং ও সিমেন্টের মতো নিঃসরণ-নিবিড় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এসব কোম্পানির অনেকেই জলবায়ুসংক্রান্ত পদক্ষেপ বিলম্বিত বা ব্যাহত করার জন্য লবিস্ট নিয়োগ করে।

অক্সফামের মতে, বিনিয়োগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অনন্য সুযোগ রয়েছে বিলিয়নেয়ারদের। কারণ কম সম্পদ রয়েছে এমন মানুষের তুলনায় তারা নিজেদের অর্থ ব্যবহারের উপায় বেছে নিতে পারেন। বিলিয়নেয়াররা যদি কম কার্বন নিঃসরণ করে— এমন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেন, তবে কার্বন নিঃসরণ বর্তমানের তুলনায় ১৩ গুণ কম হতে পারে।

সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের সঙ্গে কার্বন অসমতার পরিণতি হিসেবে আগামী শতকে অতিরিক্ত ১৫ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এখানে ধনী বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, ২০১৫-১৯ নাগাদ যাদের বার্ষিক আয় কমপক্ষে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার ছিল। গত তিন দশকে তাদের নিঃসৃত কার্বন বিশ্বের ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছে। এ সময় বার্ষিক ১ কোটি ৪৫ লাখ মানুষের ক্যালোরির চাহিদার সমান ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

অক্সফামের সিনিয়র ক্লাইমেট জাস্টিস পলিসি অ্যাডভাইজর চিয়ারা লিগুরি বলেন, ‘এসব প্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে ধনীদের বিলাসী জীবনধারা এবং দূষণ করে এমন বিনিয়োগ থেকে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ বৈষম্য, ক্ষুধা বাড়ার সঙ্গে জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে। এটি কেবল অন্যায় নয় যে তাদের বেপরোয়া দূষণ আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে, বরং এটি প্রাণঘাতীও।’