ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বিভাজন ও বৈষম্যের পাশাপাশি পপুলিজম বা জনতুষ্টিবাদ বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক শ্লথগতির মাঝে ইউরোপের দেশগুলোয় এ প্রবণতা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রেণী কক্ষে অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে আলোচনা শুধু মন্দার ইতিহাস পাঠ নয়, এটি গণতন্ত্রের পাঠও; যা শিক্ষার্থীদের জনতুষ্টিবাদের সমালোচক করে তোলে। খবর ইউরো নিউজ।

মহাদেশটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে কাজ করে কাউন্সিল অব ইউরোপ। সংস্থাটির অন্যতম প্লাটফর্ম দ্য অবজারভেটরি অন হিস্ট্রি টিচিং ইন ইউরোপের (ওএইচটিই) নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী অতীতের অর্থনৈতিক অভিঘাত সম্পর্কে পাঠ শিক্ষার্থীদের মাঝে দোষারোপমূলক বয়ানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

জাতীয় অর্থনীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের সংকটের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ইউরোপীয় অনেক দেশে ধারাবাহিক বা পুনরাবৃত্তি অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য, সংখ্যালঘু বিদ্বেষ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্ন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ওএইচটিই বলেছে, অর্থনৈতিক সংকটের পাঠ সংখ্যালঘু বা অবহেলিত গোষ্ঠীর প্রতি দোষারোপের সরলীকৃত ব্যাখ্যা এড়াতে সাহায্য করে। ইউরোপীয় দেশগুলোয় ইতিহাস শিক্ষার বিষয়গুলো সমন্বয় করতে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ওএইচটিই।

গবেষকদের যুক্তি হলো ঐতিহাসিকভাবে দোষারোপের সংস্কৃতি ও তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য অর্থনৈতিক বৈষম্য বিষয়ে পাঠদান গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপিয়ান জার্নাল অব পলিটিক্যাল রিসার্চের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী যেসব মানুষ মনে করে সমাজ খুবই বৈষম্যপূর্ণ, তাদের পপুলিস্ট দল সমর্থন করার সম্ভাবনা বেশি। জরিপে দেখা গেছে, সমাজকে যারা সমতাপূর্ণ মনে করেন তাদের তুলনায় বৈষম্যপূর্ণ ভাবা ভোটাররা পপুলিস্ট দলের প্রতি প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি সমর্থন দেখান। নরওয়ের প্রগ্রেস পার্টি, ডেনিশ পিপলস পার্টি ও অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির মতো বড় ডানপন্থী পপুলিস্ট দলের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়।

২০২৩ সালে প্রকাশিত ইউরোপিয়ান সোশ্যাল সার্ভের (ইএসএস) তথ্য অনুযায়ী, আর্থিকভাবে স্বচ্ছলদের তুলনায় কষ্টে থাকা ব্যক্তিদের পপুলিস্ট দল সমর্থন করার সম্ভাবনা বেশি। বিভিন্ন দেশ ও বছরের জরিপে দেখা যায়, আয় নয় বরং অর্থনৈতিক চাপ বা আর্থিক কষ্ট পপুলিস্ট দলের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়।

শিক্ষকদের উদ্দেশে ওএইচটিইয়ের পরামর্শ হলো, শুধু ‘গ্রেট ডিপ্রেশন কী ছিল’ বললেই পাঠ শেষ হয় না। বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে সহানুভূতি, খোলামেলা মন নিয়ে আলোচনা, সহযোগিতা ও অস্পষ্ট বিষয়গুলো জানার জন্য সহনশীলতার বিকাশ ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীরা যখন ইতিহাসের আলোকে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করে, তারা গভীরভাবে প্রশ্ন করতে শেখে। এতে তারা বুঝতে পারে, এ সংকট শুধু অর্থনীতিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজের সব দিককে প্রভাবিত করে।

১৭টি ইউরোপীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি হয়েছে এ প্রতিবেদন। এর মধ্যে স্পেন ছাড়া সব দেশে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অর্থনৈতিক সংকট অন্তর্ভুক্ত। স্পেনে শিক্ষকের বিবেচনা অনুসারে বিষয়টি পাঠে অন্তর্ভুক্ত হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, জর্জিয়া ও স্পেন ছাড়া সব দেশে অর্থনৈতিক সংকট সরাসরি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। ফরাসি বিপ্লব ও ১৯৮০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সংকট সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে অর্থনৈতিক দুর্বিপাককে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উদ্দীপকরূপে দেখানো হয়। অন্যদিকে গ্রেট ডিপ্রেশনের মতো বড় অর্থনৈতিক সংকটগুলোর ফলে ইউরোপের কিছু দেশে গণতন্ত্র দুর্বল বা ধ্বংস হয়েছিল। এর সঙ্গে ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদের উত্থান সরাসরি যুক্ত। কারণ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মানুষকে চরমপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকটকে সংখ্যালঘু বা দুর্বল গোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে শেখানো উচিত। এটি চরমপন্থা উসকে দেয়া এমন বয়ানের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

বিশ্লেষণের শেষ দিকে বলা হয়েছে, ইউরোপে অর্থনৈতিক সংকট পাঠের ক্ষেত্রে বড় ফাঁক রয়েছে। পাঠ্যক্রমে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ থাকলেও সাধারণত প্রধান্য পায় ম্যাক্রোইকোনমিক ডাটা ও সময়ক্রম। মানবিক ও সামাজিক প্রভাবের ওপর মনোযোগ থাকে কম। অনেকে এক্ষেত্রে ক্রস-সাবজেক্ট রিসোর্সের অভাবের কথা উল্লেখ করেন।