জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি প্রভাব পড়ছে আর্থিক কর্মকাণ্ডেও। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা প্রদেশের রাজধানী শহর ফিনিক্স। এখানে দিনে গড়ে ১১৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। আর এ তাপমাত্রার প্রভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। খবর সিএনএন।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যেও অনেক ব্যবসায়ীকে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। জাইডেকোর লুইসিয়ানা কিচেন ফুড ট্রাক ও জাইডেকোরটু জিওক্স ওয়াক-আপ উইন্ডো নামে দুটি খাবারপ্রতিষ্ঠান চালান লিন থমাস। জাইডেকোর লুইসিয়ানা কিচেন ফুড ট্রাক মূলত মোবাইল ফুড ট্রাক যা বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রি করে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যে লিন থমাসের পক্ষে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিনিক্সে ২৩ দিন ধরে ১১০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা বিদ্যমান। এ অবস্থায় থমাসের পক্ষে তার ট্রাক পার্ক করে গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করা কঠিন। তাই তিনি ক্যাটারিং ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। লিন থমাসের মতো অনেকেই তাপমাত্রা অতিরিক্ত বাড়ার ফলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ নারী ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভয়াবহ গরম। এ অবস্থাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা আমি জানি না, মনে হচ্ছে গরম বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি। এমনকি রাতের বেলায় যখন সূর্য ডুবে যায় তখনও গরম।’

ফিনিক্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ অংশের রেকর্ড তাপপ্রবাহ কয়েক লাখ আমেরিকানদেরই শুধু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং ব্যবসায়িক খরচ বাড়িয়ে দিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এখনো প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন কিংবা কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। তবে এ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রভাব থেকেও বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ১০ হাজার কোটি ডলার পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। বিষয়টির প্রতি যদি নজর না দেয়া হয়, তাহলে এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ২১০০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের এক-ষষ্ঠাংশকে হ্রাস করতে পারে।

মুডি’স অ্যানালিটিক্সের অর্থনৈতিক গবেষণা পরিচালক ক্রিস লাফাকিস সিএনএনের পক্ষ থেকে পাঠানো ইমেইলের প্রশ্নের জবাবে লিখেছেন, ‘‌সাম্প্রতিক তাপদাহ ও গ্রীষ্মের চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধিসংক্রান্ত চাপ অর্থনৈতিক খরচ বাড়িয়ে দেয়। মৃত্যুর কারণ হতে পারে তাপদাহ। পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত তাপদাহ বাসা, অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় শীতল করার খরচ বাড়িয়ে আঞ্চলিক পাওয়ার গ্রিডকেও চাপে ফেলতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌শ্রমিকরা বিশেষ করে যারা ঘরের বাইরে কাজ করে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তাদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। মুডি’স অ্যানালিটিক্স অনুমান করছে যে হিট স্ট্রেসের কারণে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ঝুঁকি তৈরির ফলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জিডিপি ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।’

আটলান্টিক কাউন্সিলের অ্যাড্রিয়েন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশন রেজিলিয়েন্স সেন্টারের পরিচালক ক্যাথি বাঘম্যান ম্যাকলিওড বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমের মধ্যে আমাদের চিন্তাভাবনা ধীর হয়ে যায়, একাগ্রতা ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে, হাত-চোখের মধ্যকার সমন্বয়ে ব্যাঘাত ঘটে, আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, ভুল করি। ২০২১ সালে আটলান্টিক কাউন্সিলের পক্ষ থেকে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে ১০ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।