নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীতে যখন বৈশ্বিক পণ্যবাজার টালমাটাল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন ব্যতিক্রম দেখা গেছে স্বর্ণের ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ রয়েছে স্বর্ণের প্রতি। এর জের ধরে ক্রমশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে মূল্যবান ধাতুটির বাজার। মহামারীর মধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে স্বর্ণ। এখনো তুলনামূলক বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে মূল্যবান ধাতুটি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির যেকোনো অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন দেখা দেয়। চলতি সপ্তাহে বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এ সপ্তাহেই সুদহার নিয়ে নতুন ঘোষণা দিতে পারে। প্রকাশ পেতে পারে করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান খাতের হালনাগাদ তথ্য। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় ঘেরা নতুন একটি সপ্তাহ শুরু করছে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজার।

চলতি বছরের শুরু থেকেই স্বর্ণের বাজার তুলনামূলক চাঙ্গা হতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ চীন থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে করোনা সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করা হলে মূল্যবান ধাতুটির মূল্যবৃদ্ধি আরো জোরালো হয়। চলতি বছরজুড়ে জুয়েলারি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে স্বর্ণের চাহিদা কম ছিল। এর পরও মূল্যবান ধাতুটির দাম বেড়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যকার অনিশ্চয়তা।

যেকোনো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মন্দার সময় বিশ্বজুড়ে সেফ হ্যাভেন বা নিরাপদ বিনিয়োগ উৎস হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। করোনাকালে শেয়ার ও মুদ্রাবাজারের অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বর্ণ নিয়ে আগ্রহ বাড়িয়েছে। ফলে বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে। বেড়েছে দাম। এ ধারাবাহিকতায় গত আগস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৭২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইতিহাসে এর আগে কখনই এত দামে স্বর্ণ বিক্রি হয়নি। মূলত এ সময় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ মূল্যবান ধাতুটির দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

তবে আগস্টের পর থেকে স্বর্ণের দাম রেকর্ড অবস্থান থেকে কমে এসেছে। স্পটমার্কেটে আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৮৫৯ ডলারে সর্বশেষ সপ্তাহ শেষ করেছে স্বর্ণের দাম। আর বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভবিষ্যতে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ১ হাজার ৮৮০ ডলার ২০ সেন্ট। এক মাসের মধ্যে এটাই স্বর্ণের সর্বনিম্ন দাম। এ পরিস্থিতি থেকে সহসাই ঘুরে দাঁড়াতে পারে মূল্যবান ধাতুটির বাজার। কেননা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে বিবেচনা করা হচ্ছে চলতি বছরের সবচেয়ে অনিশ্চিত সাতদিন হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ সময় স্বর্ণের দাম ফের আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

স্বর্ণের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যকার এ নির্বাচন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং পুরো বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। বাদ যাবে না পণ্যবাজার। এ বিষয়ে ফোয়েনিক্স ফিউচার্স অ্যান্ড অপশনস এলএলসির প্রেসিডেন্ট কেভিন গ্রেডি বলেন, স্বর্ণের বাজারে বছরের সবচেয়ে অনিশ্চিত সপ্তাহ এটা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

অনেকটা একই সুরে মন্তব্য করেছেন কিটকো মেটালসের গ্লোবাল ট্রেডিং ডিরেক্টর পিটার হুগ। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেন নির্বাচনে যে জিতুক না কেন একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হবে এটা অনুমেয়। আর এর প্রভাব পড়বে স্বর্ণের বাজারে। প্রতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বেড়ে যায় স্বর্ণের দাম। এবার পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে। একদিকে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা মহামারী পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিয়ে। প্রতিদিনই রেকর্ডসংখ্যক কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাজার পরিস্থিতি।

শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নয়, বরং চলতি সপ্তাহে আরো কয়েকটি ঘটনা স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের বৈঠক। বৈঠকে বিদ্যমান সুদহার পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা হলে নতুন সুদহার স্বর্ণের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বুধবার প্রকাশিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান খাতে অক্টোবরের হালনাগাদ তথ্য। ফেডের সুদহার ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানের উত্থান-পতন বরাবরই স্বর্ণের সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এবারও নির্বাচনের ডামাডোলে এ দুটি বিষয় স্বর্ণের বাজারে অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেভিন গ্রেডি বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্বর্ণের আউন্স ১ হাজার ৯৭০ ডলারে উন্নীত হতে পারে। আর পিটার হুগের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী অনিশ্চয়তায় স্বর্ণের আউন্স ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বাজার ও অবকাঠামোগত তথ্য প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান রেফিনিটিভ মেটাল রিসার্চের পরিচালক ক্যামেরুন আলেকজান্ডার বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৮৯০ ডলারে। অন্যদিকে টমসন রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৯৬৫ ডলারে। চলতি ও আগামী—দুই বছরই স্বর্ণের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

 

কিটকো নিউজ, ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স অবলম্বনে