২০১৯-২০ মৌসুমে ময়দার বৈশ্বিক রফতানি পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিল (আইজিসি)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ লকডাউনে রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সরবরাহ শৃঙ্খল অনেকটা ভেঙে পড়েছে। পণ্য আমদানি, রফতানি বা সরবরাহ সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। এর জের ধরে কিছু দেশে ময়দা রফতানি হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যটির রফতানি অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি ২০১৯-২০ মৌসুমে ময়দার বৈশ্বিক রফতানি কমে যেতে পারে। খবর ওয়ার্ল্ডগ্রেইনডটকম।

আইজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে ময়দার বৈশ্বিক রফতানি কমে ১ কোটি ৪৮ লাখ টনে নামতে পারে, আগের মৌসুমের তুলনায় যা ৫ শতাংশ কম। প্রতিষ্ঠানটির এ পূর্বাভাস সত্যি হলে তা ২০১৬-১৭ মৌসুমে খাদ্যপণ্যটির রেকর্ড রফতানির তুলনায় বেশ কমতির দিকে থাকবে। এ সময় বিশ্বজুড়ে মোট ১ কোটি ৭৬ লাখ টন ময়দা রফতানি হয়েছিল, যা ছিল পণ্যটির রেকর্ড বৈশ্বিক রফতানি।

ময়দা আমদানির বৈশ্বিক তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। এবারো দেশটি নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকতে পারে। আইজিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সব মিলিয়ে ২২ লাখ টন ময়দা আমদানি করতে পারে আফগানিস্তান। এ সময় ১৯ লাখ টন ময়দা আমদানি করে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে থাকতে পারে ইরান। আগের মৌসুমের তুলনায় উভয় দেশেই পণ্যটি আমদানির পরিমাণ কমে যেতে পারে তিন লাখ টনের মতো।

ময়দার অন্যতম আমদানিকারক দেশ উজবেকিস্তান ও ব্রাজিলও পণ্যটির আমদানি কমিয়ে আনতে পারে। উভয় দেশেই পণ্যটির আমদানির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ছয় লাখ টন করে। খাদ্যপণ্যটির আমদানিতে দেশ দুটি থাকতে পারে তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে।

তবে ২০১৯-২০ মৌসুমে ময়দার আমদানি বাড়াতে পারে ইরাক ও সিরিয়া। আইজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে সিরিয়া গত বছরের তুলনায় পণ্যটির আমদানি বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া এ সময় অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তায় খাদ্যপণ্যের মজুদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আটা ও ময়দা আমদানি বাড়াতে পারে ইরাক।

আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানের ময়দা আমদানি হ্রাসের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে প্রধান আমদানি বাজার থেকে পণ্যটির সরবরাহ কমে আসা। দেশ দুটির ময়দা আমদানিতে সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে কাজাখস্তান। বর্তমানে পণ্যটির আমদানি বাড়াতে বিকল্প উেসর সন্ধান করছে উভয় দেশ।

এদিকে ফিলিপাইনসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র বাজারে ময়দা রফতানিতে একই চিত্র দেখা যেতে পারে। আইজিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে ফিলিপাইনের ব্যবসায়ীরা এক লাখ টনের মতো ময়দা আমদানি করতে পারেন। আগের মৌসুমে দেশটি মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টন ময়দা আমদানি করেছিল। এছাড়া মিসর, লিবিয়া, তুরস্ক, মরক্কোসহ সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো চলতি মৌসুমে সম্মিলিতভাবে ২০ লাখ ৩০ হাজার টনের মতো ময়দা আমদানি করতে পারে।

অন্যদিকে পণ্যটির রফতানি বাণিজ্যে এ মৌসুমেও যথারীতি তুরস্কের আধিপত্য বজায় থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আইজিসি। আইজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে তুরস্ক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫৩ লাখ টন ময়দা রফতানি হতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানটির জানুয়ারির প্রাক্কলনের তুলনায় ১ লাখ টন বেশি এবং আগের মৌসুমের তুলনায় বেশ বেশি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে দেশটি মোট ৪৯ লাখ টন ময়দা রফতানি করেছিল। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে তুরস্ক থেকে ময়দা রফতানি বাড়তে পারে চার লাখ টন।

এদিকে তুরস্কের চেয়ে ঢের পিছিয়ে ময়দা রফতানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে থাকতে পারে কাজাখস্তান। চলতি মৌসুমে দেশটি ২০ লাখ টন ময়দা রফতানি করতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে দেশটিতে ময়দা উৎপাদন ব্যাপকহারে কমে গেছে, যা এ মৌসুমেও অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে চলতি মৌসুমে দেশটি থেকে ময়দা রফতানি কমে কমপক্ষে ২০০৭-০৮ মৌসুমের রেকর্ড নিম্ন রফতানির পর্যায়ে নেমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইজিসি।

এছাড়া কাজাখস্তান থেকে ময়দা রফতানি হ্রাসের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ। এ সময় অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে অন্যান্য দেশের মতো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটি। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি এপ্রিল ও মে মাসে গম ও ময়দা রফতানিতে নির্দিষ্ট কোটা বেঁধে দিয়েছে। এমনকি আগামী জুনেও পণ্যটির রফতানি কোটা অব্যাহত রাখতে পারে দেশটি।

তবে এ সময় আর্জেন্টিনার ময়দা রফতানিতে উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে। ২০১৯-২০ মৌসুমে দেশটি নয় লাখ টন ময়দা রফতানি করে তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে থাকতে পারে। আগের মৌসুমে আর্জেন্টিনা থেকে মোট ৮ লাখ ৭৬ হাজার টন ময়দা রফতানি হয়েছিল।

তবে ২০১৯-২০ মৌসুমে ময়দার বৈশ্বিক রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা বাজায় থাকলেও পরের মৌসুমে খাতটিতে চাঙ্গা ভাব ফিরতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইজিসি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২০-২১ মৌসুমে পণ্যটির বৈশ্বিক রফতানি বেড়ে ১ কোটি ৫১ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে, চলতি মৌসুমের তুলনায় যা ২ শতাংশ বেশি। মূলত আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানে পণ্যটির ক্রয় এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া আগামী মৌসুমে কাজাখস্তান থেকে ময়দা রফতানি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।