কভিড-১৯ মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন বন্ধের পর গত ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই উন্মুক্ত হয় চীনা বাজার। এ সময়ে মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির বাজারটিতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে বাস্তবে প্রত্যাশিত লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে চীনা অর্থনীতির শ্লথগতিকেই প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দায়ী করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
মার্কিন কোম্পানি এস্তি লডার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানটির চলতি সপ্তাহে প্রত্যাশার তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি কমে যায়। চীনা বাজারের অস্থিতিশীলতা ও ধীর পুনরুদ্ধারের কারণে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয় এস্তি। ফলে এশিয়ায় বাজারে সর্বোচ্চ দরপতনের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
স্টারবাকসের মতো ভোক্তাপণ্য চেইনশপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন টেক জায়ান্ট ও লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও বিক্রয়ে নিম্নমুখী প্রবণতার ধারা অব্যাহত ছিল। দুই সপ্তাহ ধরে এসব প্রতিষ্ঠান চীনা বাজারের প্রতি অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। এ বিষয়ে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি কোয়ালকমের সিইও ক্রিস্টিয়ানো রোনো অ্যামন বলেন, ‘চীনা বাজার পুনরায় খোলার পর সর্বাত্মক পুনরুদ্ধার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আমরা সে রকম কোনো লক্ষণ এখনো দেখিনি।’
কোয়ালকমের প্রতিযোগী এনএক্সপি সেমিকন্ডাকটরসও একই সতর্ক বার্তা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও কার্ট সিয়েভার্স বলেন, ‘চীনের পুনরুদ্ধারের বিষয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না। আমরা অত্যন্ত শ্লথগতিতে শুরু করে ধীরে ধীরে উন্নতি দেখছি।’
ভোক্তা কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও পুনরুদ্ধারের গতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। বিশেষ করে যারা এস্তি লডারের মতো ভ্রমণ ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। হিল্টন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট কোম্পানির প্রধান ক্রিস্টোফার ন্যাসেটা বলেন, ‘এ বছর যেটা প্রত্যাশা করেছিলাম, চীনের বাজার তেমন অবদান রাখবে না।’
এদিকে ফিনল্যান্ডের উড়োজাহাজ সংস্থা ফিনএয়ার জানিয়েছে, প্রত্যাশার তুলনায় পুনরুদ্ধার ছিল ধীর। যেখানে মার্কিন প্রতিষ্ঠান কলগেট-পালমোলিভ জানিয়েছে, এখন পর্যটন খাতের ব্যবসায়ের পুনরুদ্ধার লক্ষ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ভিন্ন চিত্রও আছে। কিছু কোম্পানি বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বিলাসবহুল পণ্য বিক্রেতা এলভিএমএইচ। প্রথম প্রান্তিকে এশিয়াজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় শক্তিশালীভাবে বেড়েছে। ফরাসি প্রতিষ্ঠানটির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) জ্যঁ-জ্যাক গুয়োনি জানিয়েছেন, তিনি চীনা বাজারের স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
প্রতিবেদন বলছে, যেসব কোম্পানি খুব বেশি প্রত্যাশা করেনি তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে অ্যাডিডাসের নাম উল্লেখযোগ্য। জার্মান খেলাধুলাবিষয়ক কিটস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির ধারণা ছিল, চীনা বাজারে বিক্রয় কমতে পারে এবং বাজার পরিস্থিতিও থাকবে অস্থিতিশীল। কিন্তু নির্মাতা জায়ান্টটির শেয়ার সম্প্রতি ৮ শতাংশ বেড়েছে। বেশ কয়েক বছরের মধ্যে ইতিবাচক প্রবণতা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্টারবাকস বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তবে রিটেইল জায়ান্টটি বলেছে, আর্থিক প্রবৃদ্ধি এরই মধ্যে ধীর হতে শুরু করেছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মতো খাতের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে।
চীনের সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি উপাত্তের তথ্যানুযায়ী, দেশটি ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বাস্তবতা বলছে, এ খবরে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর শঙ্কা কাটেনি। চীনা অর্থনীতি বছরের শক্তিশালী সূচনা প্রকাশ করলেও মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
সিআইবিসি প্রাইভেট ওয়েলথের চিফ ইনভেস্টমেন্ট কর্মকর্তা (সিআইও) ডেভিড ডোনাবেডিয়ান বলেন, ‘কিছু পর্যবেক্ষক একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে খুব আশাবাদী ছিলেন। অনেকেই অনুকূল আর্থিক নীতির কথা ভাবছিল, যাতে প্রবৃদ্ধি আরো গতিশীল হয়। বড় ধরনের পুনরুদ্ধার বিস্ফোরণের প্রত্যাশা করলেও আদতে সে রকম কিছু ঘটেনি।’










