মূল্যস্ফীতি নাকাল করে রেখেছে ইউরোপের অর্থনীতিকে। অন্যতম কারণ হিসেবে আছে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোয় মূল্যস্ফীতির অজুহাতে বাড়তি আয় হাতিয়ে নেয়ার প্রবণতা। উৎপাদন ব্যয়ের ভার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের দিকে বাইপাস করে দিচ্ছে, তার কারণেই ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে মূল্য বাড়ছে পণ্যের। মূল্যবৃদ্ধির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে অতিক্রম করে যাওয়ারও প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রিটেনের বাজার তদারকি কর্তৃপক্ষ কিছু প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছিল। তাদের মধ্যে রয়েছে আসডা, সেইনসবেরি ও টেসকোর মতো প্রতিষ্ঠানের নাম। উচ্চ খরচের সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বাড়তি লাভ করে নিচ্ছে গ্রাহককে ঠকিয়ে। যদিও ব্যবসায়ীরা পরবর্তী সময়ে অভিযোগ থেকে মুক্ত হন। কিন্তু উচ্চ মূল্যের দৃষ্টিভঙ্গি বাজার থেকে বাদ পড়ে যায়নি। ইচ্ছাকৃত মূল্য বাড়ানোর অভিযোগ অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও যুক্ত হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত অর্থনীতিগুলো সচরাচর দেখা যেত না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মূল্যস্ফীতির দৌরাত্ম্য লক্ষ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নাগালের মধ্যে চলে আসছে। কিন্তু ইউরোপের পরিস্থিতি এখনো অনেক বাইরে। জার্মানিতে চলতি বছরের জুলাইয়ে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দেশটিতে টানা ১৫তম মাসের মতো ঊর্ধ্বমুখী খাদ্যমূল্য। ব্রিটেনে মূল্য বেড়েছে ১৪ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের এ মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের চালানো জরিপে দেখা গেছে, গত বছরে নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব ছিল ২৬ শতাংশ পর্যন্ত, যা ২০ বছরের সর্বোচ্চ। দেশে দেশে সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। তারা শক্তিশালী করেছে কোম্পানিগুলোর পণ্যের দাম নির্ধারণ ও প্রচারণা আচরণের ওপর।
এ কথা সত্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ব্যবসায়ীরা। মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে কোম্পানিগুলোর লাভ করে নেয়ার অপকৌশল পরিচিত গ্রিডফ্ল্যাশন নামে। ইউরোপের ৭০টির মতো খাদ্য ও শিল্পোৎপাদন কোম্পানি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে দেখা গেছে, বড় একটা অংশই মূল্যস্ফীতিকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। ২০২২ সালের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম দিকে ইবিআইটিডিএ খাদ্যপণ্যে বেড়েছে ১১ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্পোৎপাদন পণ্যে বেড়েছে ১২ শতাংশ। মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অলিভার ওয়েইম্যানের অংশীদার রাইনার মুয়েঞ্চ দাবি করেছেন, খাদ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো মূল্যস্ফীতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে, যেন তারা ব্যয় ব্যবস্থাপনা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বিষয়টির প্রতি জোরারোপ করেছে। ২০২২ সালে করপোরেট খাতে আয়ের ৪৫ শতাংশের পেছনে প্রধান কারণ ইউরোপের মূল্যস্ফীতি। ব্যবসার ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক যে ব্যবসায়ীরা যেকোনোভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর কথা ভাববে। কিন্তু ইউরোপের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা আরো ঘনীভূত, সেখানে মজুরি বৃদ্ধি খুবই ধীরগতিতে হচ্ছে পণ্যের দাম বাড়ার তুলনায়।
অরগানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন ও ডেভেলপমেন্ট অনুসারে, জার্মানির করপোরেট আয় ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে বেড়েছে ২৪ শতাংশ। সেখানে শ্রম মজুরি বেড়েছে ১৩ শতাংশ। অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থা খুব একটা ভিন্ন না।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রয় টানা চতুর্থ মাসের মতো বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। জুনেও ইউরোজোনে খুচরা বিক্রিয় মাসিক ও বার্ষিক—উভয় ভিত্তিতেই বেড়েছে। জাপানেও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। দেশটিতে ভোক্তামূল্য সূচক বার্ষিক ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে জুলাইয়ে। তবে জাপানে মজুরির স্বল্পতা ও মূল্যের মধ্যে এখনো ব্যবধান স্পষ্ট। তবে বিদেশীদের জন্য জাপানের খুচরা মূল্য এখনো যথেষ্ট কম। বিশ্লেষকদের দাবি, জাপানি কোম্পানিগুলো ইউরোপীয় কোম্পানির মতো লোভী নয়। ফলে গৃহস্থালি ব্যয় তুলনামূলক কম।
তবে অনেক সমালোচনার পর ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো পরিস্থিতির উন্নতি করতে শুরু করেছে। তারা মজুরি বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়েছেন। জাপানিজ ব্যবসায়ীরা হয়তো দাম ধীরে বাড়াতে থাকবেন। কিন্তু যদি তারা মজুরি বৃদ্ধির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, তবে পরিস্থিতি ইউরোপীয়দের মতোই হবে।










