দেড় দশক আগেও এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতি ছিল জাপান। বৈশ্বিক পর্যায়ে এদিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল দেশটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পর বিস্ময়কর গতিতে সম্প্রসারণ হয়েছে দেশটির অর্থনীতি। বর্তমানে অর্থনীতির আকারের দিক থেকে এশিয়ায় িদ্বতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে দেশটি। বৈশ্বিক পর্যায়ে নেমে এসেছে চতুর্থ স্থানে। বর্তমানে অর্থনীতির গতি ধরে রাখা নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটির নীতিনির্ধারকদের। নানামুখী চাপে থাকা দেশটির অর্থনীতি আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এ শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা।

দেশটির বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার পদত্যাগের সাম্প্রতিক ঘোষণার পেছনেও বড় ভূমিকা রেখেছে জাপানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে তার উত্তরসূরিকেও। যদিও সামনের দিনগুলোয় এসব চ্যালেঞ্জের সহজ বা স্পষ্ট কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছেন না অর্থনীতিবিদরা।

এশীয় অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, জাপানের পরবর্তী সরকারকে একসঙ্গে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদহার, ঋণ ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বেতন কাঠামোর সংস্কার এবং প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়চাপ নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি জনমিতির দিক থেকেও বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে জাপান। জন্মহার হ্রাস ও বয়স্ক জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও দেশটির অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের জীবনযাত্রার ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে চালের মূল্যবৃদ্ধি। দেশটিতে গত বছরের বসন্ত পর্যন্ত খুচরা বাজারে পাঁচ কেজি চালের গড় দাম ছিল ২ হাজার ইয়েন বা ১৩ ডলার ৫০ সেন্ট। গত মার্চে তা ৪ হাজার ইয়েন ছাড়িয়ে যায়। শুরুতে এ মূল্যবৃদ্ধি মোকাবেলায় বড় কোনো পদক্ষেপ না নিলেও পরে সরকারি মজুদ থেকে নিলাম ছাড়াই চাল অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে দাম শীর্ষ স্তর থেকে কিছুটা কমে যায়। কিন্তু বর্তমানে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে।

দেশটিতে মূল্যস্ফীতিও এখন বাড়তে শুরু করেছে। এটি জাপানের পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। গত বছরের অক্টোবরে ইশিবা যখন দায়িত্ব নেন, তখন খাদ্য বাদ দিয়ে ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। আর জুলাই পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে আট মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ শতাংশের ওপরে।

মূল্যস্ফীতির হার খুব বেশি না হলেও প্রকৃত মজুরির ক্রমাবনতি এখন দেশটির অর্থনীতিতে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটিতে প্রকৃত মজুরির পরিমাণ অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি সমন্বিত ক্রয়ক্ষমতা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এরপর জুলাইয়ে দেশটিতে মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা ছিল একেবারেই যৎসামান্য। এ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গীন করে তুলছে ইয়েনের বিনিময় হারে টানা পতন।

বর্তমানে ইয়েনের বিনিময় হারে পতন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) সুদহার বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করা উচিত বলে অভিমত দিচ্ছেন দেশটির ক্ষমতাসীনরা। দেশটির ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ সদস্য তারো কোনো গতকাল স্থানীয় এক সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জাপানে মূল্যস্ফীতির হারকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলেছে বিওজের দুর্বল মুদ্রানীতি। সংস্থাটি যদি সুদহার বাড়াতে দেরি করে, তাহলে জাপানের আমদানি ব্যয় বাড়তির দিকে থাকবে। একই সঙ্গে গৃহস্থালি পর্যায়ে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।’

যদিও কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, এই মুহূর্তে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে সুদহার বাড়ালে তা জাপানের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সায়ুরি কাওয়ামুরা বলেন, ‘যদি পরবর্তী সরকার সম্প্রসারণমূলক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাজ্যের লিজ ট্রাসের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে জাপান। সেখানে অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ সুদহারে বড় উত্থান সৃষ্টি করেছিল।’

জাপানে গত জানুয়ারি থেকে সুদহার দশমিক ৫ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। এ মুহূর্তে বিওজের সুদহার ও সরকারের ব্যয় নীতির মধ্যে সমন্বয় আনতে না পারলে বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

শিগেরু ইশিবার মন্ত্রিপরিষদ গত জুনে বার্ষিক অন্তত ১ শতাংশ হারে জাতীয় মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ওই সময় ইশিবা বলেছিলেন, ‘এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মজুরি বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির হার ছাড়িয়ে যেতে হবে।’ যদিও সেখান থেকে বাস্তবিক কোনো ফল এখনো পাওয়া যায়নি।

আবার জাপানের শেয়ারবাজারেও এখন সরকারি প্রণোদনার দাবি উঠছে। যদিও বন্ড বিনিয়োগকারীরা সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে শঙ্কিত। শিগেরু ইশিবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময়ে জাপানে ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ড ছিল প্রায় দশমিক ৯ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

জাপানের অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় বাধা সরকারি ব্যয়চাপ। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য পূর্বাভাসে ঋণ পরিশোধের খরচ ৩২ ট্রিলিয়ন ইয়েন ছাড়িয়েছে, যা রেকর্ড উচ্চ। সামাজিক কল্যাণ ও অন্যান্য নীতি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মোট বাজেট ১২২ ট্রিলিয়ন ইয়েন ছাড়াবে।

এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিও দেশটির রফতানি অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। ১৫ শতাংশ সুদহার দেশটির বড় রফতানিকারকদের জন্য সহনশীল মাত্রার হলেও বিপাকে পড়েছে তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো।

একসময় ন্যূনতম প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জন্য পরিচিতি থাকলেও জাপানে এখন এ খাতেও ব্যয় বাড়ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য দেশটির প্রতি মিত্রদের চাপও রয়েছে। যদিও এ বাড়তি ব্যয় দেশটির করদাতাদের জন্য আরো বোঝা সৃষ্টি করবে। সরকার যদিও ২০২৭ অর্থবছরে জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এখনো এ অর্থের সংস্থান কোত্থেকে হবে, সে বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘শুল্ক বিষয় সমাধান হওয়ার পর এখন আলোচনার মূল বিষয় হবে সম্পূর্ণভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয়।’

জাপানের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর শিগগিরই কোনো সমাধান দেখছেন না বিশ্লেষকরা। অথচ একসময় দেশটির দ্রুত উত্থানকে গোটা বিশ্বে অগ্রগতির রোলমডেল হিসেবে দেখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো দেশটি কয়েক দশকের মধ্যে ইলেকট্রনিকস, উচ্চগতির ট্রেন ও রোবট প্রযুক্তিতে নেতৃত্বের আসন দখল করে নেয়। পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৬০-৮৯ সালের মধ্যে জাপানের প্রকৃত জিডিপি বেড়ে পাঁচ গুণ হয়েছিল। গত শতকের আশির দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল জাপান। ১৯৮৯ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ২০টি কোম্পানির মধ্যে ১৫টিই ছিল জাপানি। চিপ উৎপাদনেও তখন শীর্ষে ছিল দেশটি।