বিশ্ব বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের চেনা মডেল এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এতদিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ না রেখে সরাসরি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করত, যা বিশ্ব বাণিজ্যে ‘জাস্ট ইন টাইম’ মডেল নামে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক নানামুখী বৈশ্বিক সংকটে কোম্পানিগুলো এখন এ ঝুঁকিপূর্ণ মডেল থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এর বদলে আপৎকালীন সংকট মেটাতে কাঁচামাল মজুদ বাড়ানো এবং বিকল্প বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
বিশ্বের চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর খাতের দিকে তাকালে সরবরাহ ব্যবস্থার এ দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে খাতটি চিপের অভাবে নয়, বরং হিলিয়াম গ্যাসের সংকটের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে কাতারে হিলিয়াম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যটির রফতানিও হুমকির মুখে পড়েছে। হিলিয়াম গ্যাস সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ফলে বিশ্বজুড়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন হিলিয়াম সংকটের সতর্কতা জারি করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, হিলিয়াম সংকট আসলে দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোর একটি নতুন অংশমাত্র। গত কয়েক বছরে কভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুল্ক এবং হঠাৎ দেখা দেয়া জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। শুধু খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা এ বিশ্ব ব্যবস্থা সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে।
সস্তা শ্রমের দেশ থেকে মুখ ফেরাচ্ছে কোম্পানিগুলো
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোম্পানিগুলো এখন একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক ও বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট কারখানার ওপর নির্ভর করার ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প সরবরাহকারী তৈরি করা, জরুরি অবস্থার জন্য বাড়তি কাঁচামাল গুদামে মজুদ করা এবং নিজস্ব অঞ্চলের কাছাকাছি কারখানা স্থাপনে জোর দেয়া হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘অফশোরিং’ সংস্কৃতির অবসান।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিবর্তন শুধু করোনার কারণে হয়নি, বরং এর শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময় থেকে। উন্নত দেশের কোম্পানিগুলোর কাঁচামাল বা পণ্য তৈরির জন্য অনুন্নত ও সস্তা শ্রমের দেশে কারখানা সরিয়ে নেয়ার যে প্রবণতা ছিল, তা এখন প্রায় শেষের দিকে। পরিসংখ্যান বলছে, নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের মোট উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করত জি-৭ ভুক্ত ধনী দেশগুলো। গত দশকের মাঝামাঝিতে তা কমে ৩৮ শতাংশে নেমে আসে। তবে বর্তমানে তা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে স্থিতিশীল হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ব্যবসার পরিধি ঢালাওভাবে বাড়ানোর চেয়ে বড় করপোরেট গ্রুপ এখন স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণ করছে। এগুলোকে ‘চীন ফরচীন’ বা ‘ইউএস ফর ইউএস’ মডেল বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যে দেশের বাজার, পণ্য উৎপাদনও হবে তার কাছাকাছি কোনো এলাকায়। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন এর অর্থ বৈশ্বিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং কোম্পানিগুলো চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ আংশিক সরিয়ে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোর মতো বিকল্প দেশগুলোয় নিয়ে যাচ্ছে।
আঞ্চলিক সক্ষমতা ও দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে
বাণিজ্যের এ নতুন পথ তৈরি করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাইলেই রাতারাতি তাদের ভারী যন্ত্রপাতি ও কারখানা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারে না। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, নতুন কোনো দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ নতুন কোনো অঞ্চল বেছে না নিয়ে তাদের চেনা-জানা নেটওয়ার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম মজুরির কারণে কোনো দেশ প্রাথমিকভাবে বিদেশী কোম্পানিকে আকর্ষণ করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা থাকা জরুরি। এ বদলে যাওয়া বিশ্ব বাণিজ্যের সুবিধা নিতে হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু সস্তা শ্রম দিলে চলবে না। পাশাপাশি দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য স্থানীয় উপসরবরাহকারী এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তাছাড়া অনেক দেশে উৎপাদন ব্যবস্থা ছড়িয়ে থাকার ফলে ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ জটিলতা সামলাতে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিকস সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা চাপ পরীক্ষা করে তারা নিখুঁতভাবে হিসাব করছে যেকোনো দুর্যোগে একটি কারখানা বন্ধ হলে তা আবার চালু করতে কতদিন লাগবে বা মজুদ পণ্য দিয়ে কতদিন বাজার ধরে রাখা যাবে।
সরবরাহ ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি
আধুনিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় একটি উদ্বেগের বিষয় হলো মূল কোম্পানির নিরাপত্তা নির্ভর করে সরবরাহ ব্যবস্থার একদম গভীরে থাকা ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর। অতীতে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের ছোট কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে মূল ক্রেতা বা বড় ব্র্যান্ডগুলোকে বিশাল আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
সংকটকালীন যেসব কোম্পানির সরবরাহকারীদের কাছে বাড়তি মজুদ থাকে, তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকে। তবে কাঁচামালের তীব্র সংকটের সময় যদি বিশ্বের বড় ক্রেতা একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য নেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে, তখন দাম এক লাফে অনেক বেড়ে যায়, যা মুনাফা কমিয়ে দেয়। এর অর্থ হলো অনেক করপোরেট প্রধান এখনো তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলের গভীরে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
মহামারী-পরবর্তী শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা
জার্মানির প্রায় চার হাজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোর কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি তাদের পণ্য সংগ্রহের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ কোম্পানি কাঁচামাল মজুদ রাখার পথ বেছে নিয়েছে এবং ৬৫ শতাংশ কোম্পানি তাদের সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়িয়েছে।
বড় ও ছোট কোম্পানির মধ্যে এ সংকট মোকাবেলার ধরনে পার্থক্য রয়েছে। বড় কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত তহবিল থাকায় তারা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা ছড়াতে এবং আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা কিনতে পারছে। অন্যদিকে ছোট কোম্পানিগুলো তাদের সীমিত পুঁজির কারণে কেবল গুদামে বাড়তি পণ্য জমিয়ে রাখার ওপর ভরসা করছে।
এত বড় সব সংকটের পরও কিছু শিল্প বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে অনেক কোম্পানির স্মৃতিশক্তি বেশ দুর্বল। মহামারী বা যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ধাক্কা কিছুটা কমে আসতেই অনেক প্রতিষ্ঠান আবারো খরচ কমাতে তাদের পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ মডেলে ফিরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সাধারণত বেশ ধীরগতির। তাই যারা এখনই দূরদর্শিতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে না, পরবর্তী যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে তারা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।










