দুই সপ্তাহ আগেও আদানি গ্রুপের সাতটি বাণিজ্যিক কোম্পানির মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি ডলার। সেটা অর্ধেকে নেমেছে হিনডেনবার্গ রিসার্চের প্রতিবেদন প্রকাশের পর। ব্যক্তিগত সম্পদ হারিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা গৌতম আদানি। ছিটকে পড়েছেন শীর্ষ ২০ ধনকুবের তালিকার বাইরে। গভীর এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আদানি ও তার প্রতিষ্ঠানকে ভালো মাশুল গুনতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর বিবিসি।
যদিও আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও দুরভিসন্ধিমূলক বলে দাবি করা হয়েছে। তাতে ভরসা আসেনি বিনিয়োগকারীদের মনে। সম্প্রতি গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেয়ারকে কোলাটেরাল হিসেবে ব্যবহার করে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার আগাম পরিশোধ করা হবে। চলমান অস্থিরতা মোকাবেলা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতেই এ সিদ্ধান্ত। তবে শেয়ারদরের বড় ধরনের পতন আদানি গ্রুপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ শেয়ারদরের পতন কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতাকেই নির্দেশ করে, যা প্রভাব ফেলবে কোম্পানির পরিচালনায়ও।
ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলে বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় গ্রুপের অধিকাংশ বড় প্রকল্পে লাগাম টেনে ধরতে হবে। এ মুহূর্তে উচ্চতহবিল সংগ্রহ করার ক্ষমতা তাদের নেই। আদানি গ্রুপের দ্রুতবৃদ্ধির জন্য ঋণের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে আয়ের তুলনায় গ্রুপটির ঋণের বোঝা বেশি ভারী হয়ে উঠেছে।’
বর্তমানে আদানি গ্রুপের ঋণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন রুপিতে (২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার) দাঁড়িয়েছে। তিন বছরে ঋণের পরিমাণ হয়েছে দ্বিগুণ। বিশেষ করে আদানির ফাইভজি পরিষেবা ও নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পের মতো প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। ঋণের দুই-তৃতীয়াংশই বন্ড ও বিদেশী ব্যাংকের মতো বিভিন্ন উৎস থেকে এসেছে। তহবিলের সিংহভাগ এসেছে অবকাঠামোগত সম্পত্তি ও কোলাটেরাল হিসেবে পাওয়া শেয়ার থেকে। কিন্তু শেয়ারদর কমার সঙ্গে কোলাটেরালের দামও কমেছে। ফলে সংকীর্ণ হয়ে ওঠেছে শক্তি ফিরে পাওয়ার রাস্তা।
অন্যদিকে ক্রেডিট সুইস ও সিটি গ্রুপের মতো দুটি বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অস্বীকৃতি জানিয়েছে আদানি গ্রুপের বন্ডকে কোলাটেরাল হিসেবে রাখতে। আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলোকে ঋণ দিয়েছে অনেক ভারতীয় ব্যাংক। বিনিয়োগ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লাইফ ইন্সুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়া।
হিনডেনবার্গের রিপোর্ট ও তার প্রতি আদানি গ্রুপের প্রতিক্রিয়াতেও বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট না। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন লোন সৃষ্টি করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো বলেন, ‘চীনের অর্থনীতি যখন পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে, ঠিক সে সময়ে এসে আদানির কেলেঙ্কারি ফাঁস হলো। ফলে খুব সহজেই বিষয়টি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করবে।’
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের রেটিং অনুযায়ী, আদানি গ্রুপের দুটি কোম্পানির পরিস্থিতিকে নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ চাপের মুখে আদানি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (এইএল)। নবায়নযোগ্য শক্তি, উড়োজাহাজ পরিষেবা, রাস্তা ও আবাসনের মতো অধিকাংশ নতুন প্রকল্প ব্যবসা এ কোম্পানির মাধ্যমে হয়। যদিও পর্যাপ্ত ফিজিক্যাল অ্যাসেট থাকার কারণে বন্দর ও কারখানা প্রকল্প বেশ শক্ত অবস্থানেই থাকবে। বন্দর ও জ্বালানিতে আদানি কোম্পানির অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো। তবে গ্যাস ও নবায়নযোগ্য শক্তি এরই মধ্যে দেনার দায়ে জর্জরিত।
নতুন প্রকল্পগুলো থামিয়ে রেখে ও কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে আদানি গ্রুপ এ সংকট থেকে উত্তরণের একটা রাস্তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে এটাও দেখার বিষয়, আদানি গ্রুপের বাণিজ্যিক পরিচালনায় কোনো তদন্ত হয় কিনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় এর সঙ্গে রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও জড়িত। এর মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করে ভারতজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস। এতকিছুর পর হারানো আস্থা ও অবস্থান ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে আদানি গ্রুপের জন্য।










