চীনে ধীরে ধীরে অবস্থান দুর্বল হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি জেনারেল মোটরসের (জিএম)। বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি বাজারে ২০১৫ সালে কোম্পানিটির হিস্যা যেখানে ছিল ১৫ শতাংশ, ২০২২ সালে তা নেমে আসে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম কোম্পানিটির হিস্যা দুই অংকের নিচে নেমে এল। ২০১৪ সালে রেকর্ড আয়ের পর গত বছর জিএমের আয় কমেছে ৭০ শতাংশ। খবর সিএনবিসি।
চীনে শুরু হওয়া করোনা মহামারী এতে অংশত দায়ী। তবে বৈশ্বিক মহামারী শুরুর আগে থেকেই সংকটের আলামত পাওয়া যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়ছিল জিএমের পারফরম্যান্সে। এছাড়া সরকার সহায়তাপুষ্ট স্থানীয় গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোও জিএমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অন্যান্য মার্কিন কোম্পানি চীনের বাজারে কোণঠাসা হলেও জিএমের পরিস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। ফোর্ড মোটরের মতো স্বদেশী প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে জিএমের কার্যক্রম বেশ বিস্তৃত। তবে কেউ কেউ বলছেন চীনের করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলা এবং বছরের শেষ দিকে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি জিএমের ইক্যুইটি থেকে আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। অবশ্য জিএমের ইক্যুইটি থেকে আয় ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ২০০ কোটি ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করলেও ২০১৯ সালে তা ৪৫ শতাংশ কমে। ২০২২ সালে তা আরো কমে ৬৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
চীনা বাজার বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জোজো গোর সিইও মাইকেল ডান বলেন, ‘জিএমের বেহাল দশা কভিডের কারণে সৃষ্টি হয়নি। কভিড শুরুর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। প্রভাবটা কতটুকু হয়তো তা পরিমাপ করে বলা যাবে না। তবে তা বেশ বিস্তৃতই বটে।’
বিদ্যুচ্চালিত গাড়িসহ (ইভি) নতুন প্রজন্মের গাড়িতে স্থানীয় স্টার্টআপ ও গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোর অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। গত বছরে চীনে বিক্রি হওয়া যাত্রীবাহী গাড়ির এক-চতুর্থাংশ ছিল নতুন প্রজন্মের জ্বালানিচালিত। চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বাভাস, চলতি বছরে এ ধরনের গাড়ির হিস্যা ৩৬ শতাংশে দাঁড়াবে। চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্সের বরাতে জানা গেছে, ২০১৫ সালে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর হিস্যা ছিল যেখানে মাত্র ২১ শতাংশ, গত বছর তা প্রায় অর্ধেক ছাড়িয়েছে। বিপরীতে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর হিস্যা ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
ডান মনে করেন, চীনের বাজারে জিএমের অবস্থান দুর্বলের এক নম্বর কারণ চীনা জাতীয়তাবাদ। বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে বিশ্বে শীর্ষস্থান অর্জন করতে চায় চীন। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চীনের রয়েছে বিওয়াইডির মতো প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালে চীনভিত্তিক কোম্পানিটির গাড়ি বিক্রি হয়েছিল যেখানে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ইউনিট, ২০২২ সালে তা ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে প্রকাশিত কাউন্টাপয়েন্ট রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে চীনে বিক্রি হওয়া প্রতি চার গাড়ির একটি ছিল ইভি। ২০২১ সালের তুলনায় দেশটিতে গাড়ি বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ইভি বাজারের তালিকায় চীনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। দেশটির ইভি বাজার বছরওয়ারি ৮৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। অন্যদিকে ১১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইভি খাতের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারমাণ বাজার ছিল জাপান। তবে বিক্রির অংকে একচ্ছত্র আধিপত্য চীনের। গত বছর বিশ্বের মোট ইভি বিক্রির প্রায় ৫৯ শতাংশ ছিল চীনে।
কাউন্টারপেয়ন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সৌমেন মণ্ডল জানান, বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে চাঙ্গা ইভি বাজার চীনের। ৯৪টির মতো ব্র্যান্ড ৩০০ মডেলের ইভি উপহার দিয়েছে। ৫ হাজার ডলার থেকে শুরু করে ৯০ হাজার ডলারে পাওয়া যাচ্ছে গাড়ি। ইভি বাজারের ৮১ শতাংশ স্থানীয় ইভি ব্র্যান্ডের দখলে। শীর্ষ ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে বিওয়াইডি, উলিং, চেরি, চ্যাংগান ও জিএসি। এছাড়া নিও, এক্সপেং, নেটা, লিভানের মতো স্টার্টআপও রয়েছে এ দৌড়ে।










