বিশ্ববাজারে গমের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর খাদ্যশস্যটির বৈশ্বিক বাজার যতটা সংকটে ছিল তার থেকে সহনীয় পর্যায়ে নেমেছে সরবরাহ। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যটির দাম কমছে না। যার কারণে চালের পর দ্বিতীয় খাদ্যশস্য হিসেবে আটা-ময়দার বাজার এখনো চড়া।
এক থেকে দেড় বছর আগেও দেশে পাইকারি পর্যায়ে গমের দাম ছিল মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৯০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ টাকা। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটকে পুঁজি করে দেশে গমের পাইকারি দাম বেড়ে সর্বনিম্ন ১ হাজর ৯০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় উঠে যায়। বর্তমানে দাম কিছুটা কমে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে লেনদেন হলেও বিশ্ববাজারে দাম কমার প্রভাব শতভাগ পড়েনি গমের বাজারে।
বিশ্বব্যাংকের পিঙ্কশিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২১ সালে বৈশ্বিক গমের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ৩১৫ ডলার। ২০২২ সালে এসে গমের দাম বেড়ে ৪৩০ ডলারে পৌঁছে। একই বছরের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে পণ্যটির দাম রেকর্ড ৪৯৩ ডলারে উঠে যায়। যদিও এরপর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রফতানিতে রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তির কারণে বিশ্বব্যাপী গমের দাম কমতে শুরু করে। বিশ্বের মোট গম চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ রাশিয়া-ইউক্রেন অঞ্চল থেকে সরবরাহ হওয়ায় বিশ্ববাজার অস্থির হলেও বর্তমানে স্থিতিশীলতার দিকে ফিরছে।
খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ফারুক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গমের সাধারণ ক্রেতা সংখ্যা খুবই কম। ছোট ফ্লাওয়ার মিলগুলো পাইকারি বাজার থেকে গম ক্রয় করলেও দেশের বৃহৎ ফ্লাওয়ার মিল মালিকরা নিজেরাই গম আমদানির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিশ্ববাজারে গমের দাম কমলেও অতিমুনাফার আশায় দাম সমন্বয়ে অনীহা রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এক্ষেত্রে সরকারের তদারকি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।’
প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে গমের টনপ্রতি গড় দাম ছিল ৩৭৮ ডলার। মে মাসে দাম আরো কমে ৩৬৭ ডলার এবং জুনে সেটি আরো কমে ৩৪৫ ডলারে নেমে এসেছে। ২০২১ সালের বার্ষিক গড় দামের পর্যায়ে দাম নামতে মাত্র ৩০ ডলারের ব্যবধান রয়েছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে গমের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হাতেগোনা। সরকারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গম আমদানি করে। বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়ত দাম কমলেও দেশের বাজারে পণ্যটির দাম সেভাবে সমন্বয় হচ্ছে না। যার কারণে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ফ্লাওয়ার মিল মালিকরা চাইলেও আটা-ময়দার দাম কমাতে পারছে না।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে মণপ্রতি ভারতীয় গম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। অপরদিকে কানাডা থেকে আমদানি হওয়া গম বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০ টাকায়। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে গমের দাম কমছে ধীরগতিতে। যার কারণে ফ্লাওয়ার মিলগুলোও আটা-ময়দার দাম কমাচ্ছে না।
জানতে চাইলে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্য নিয়ে যেভাবে অতিমুনাফা করে সেটি বিশ্বে আর কোথাও নেই। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই আগের কেনা পণ্যের দাম হঠাৎ করেই বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও তারা দাম কমাতে চান না। গমের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে আটা-ময়দার বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে কঠোর মনিটরিং কার্যক্রম পালন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।










