কমতে শুরু করেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক দাম। বিশ্লেষকরা যেমনটা প্রত্যাশা করেছিলেন, বর্তমানে তার চেয়ে কম দামে লেনদেন হচ্ছে জ্বালানিটি। টানা কয়েক বছর ধরেই বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ সংকট চলছে। এ বছরের শেষ নাগাদ এ সংকট কেটে যাবে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল। 

দাম কমার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা জানান, এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোয় স্বাভাবিকের তুলনায় শীতের তীব্রতা কম। ফলে হিটিং জ্বালানি হিসেবে এলএনজি চাহিদা বাড়ার কোনো লক্ষণ নেই। পাশাপাশি এসব অঞ্চলে এলএনজির মজুদও সন্তোষজনক। অন্যদিকে শীর্ষ গ্যাস ব্যবহারকারী দেশগুলোয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ধীরগতিও দাম কমার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। 

তীব্র শীত মৌসুম ও লোহিত সাগরে চলমান সংঘাতের পরও অনেকটাই কমে এসেছে এলএনজির সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। এর ফলে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম এরই মধ্যে ১০ ডলারে নেমে এসেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের হিসাব অনুযায়ী, ১৮ জানুয়ারি এলএনজির জাপান-কোরিয়া বাজার আদর্শ বা জেকেএমের মার্চে সরবরাহ চুক্তির দাম এমএমবিটিইউপ্রতি ৯ ডলার ৪৩ সেন্টে নেমে যায়। 

মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি বছর বিশ্ববাজারে চাহিদার তুলনায় কিছুটা বেশি থাকবে এলএনজি সরবরাহ। উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪০ লাখ টনে। জেকেএমের মূল্য পূর্বাভাসও সংশোধন করে কমিয়েছে ব্যাংকটি। সে হিসেবে এ বছর প্রতি এমএমবিটিইউর গড় মূল্য দাঁড়াতে পারে ১১ ডলারে, আগের পূর্বাভাসে যা ছিল ১৪ ডলার ৫০ সেন্ট। 

ব্যাংকটির বিশ্লেষকরা বলছেন, আমরা যেমনটি পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, তার চেয়েও ভালো থাকবে সরবরাহ পরিস্থিতি। এতে বাজারে সম্ভাব্য কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলেও তা সামাল দেয়া যাবে। তবে শীতের তীব্রতা বাড়লে অনিশ্চয়তাও দেখা দিতে পারে। 

২০২২ সালের প্রথম দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানিটির সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় ইউরোপ। সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতা এরই মধ্যে কাটতে শুরু করেছে। তবে বাজার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সানফোর্ড সি বার্নস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানির এমডি নেইল বেভারিজ বলেন, ‘গ্যাস সংকট নিয়ে তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বৈশ্বিক বাজার। তবে ব্যবহারকারীদের জন্য ভাল খবর হলো যে এ সংকটের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এ বছরের শেষ দিকে বাজারে নতুন সরবরাহ আসবে। বছরে অতিরিক্ত সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১৪ কোটি টনে। আগামী তিন বছর পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে।’ 

বার্নস্টেইন রিসার্চ জানায়, আগামী বছর এলএনজির বৈশ্বিক সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে কাতার ও উত্তর আমেরিকা। এর মধ্য দিয়ে দাম আরো কমে আসতে পারে। 

তবে সামষ্টিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। অস্ট্রেলিয়ার এএনজেড ব্যাংক সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, চলতি বছর সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির বেশ ভালো প্রভাব দেখা যাবে বৈশ্বিক পণ্যবাজার। বিশেষ করে পণ্যের চাহিদায় প্রভাব ফেলবে এটি। যদিও এ সমস্যা বেশি দিন স্থায়ী হবে না বলেও জানিয়েছে ব্যাংকটি। এটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির গড় মূল্য দাঁড়াবে ১১ ডলার ৩০ সেন্টে। আগামী বছর তা ১৪ ডলার ১০ সেন্টে উন্নীত হবে। 

ব্যাংক অব আমেরিকা জানায়, চলতি দশকের দ্বিতীয়ার্ধে আবারো বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি ক্রেতা দেশে পরিণত হবে চীন। এ সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মধ্যে দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনার উপায় খুঁজে নেবে ইউরোপ।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরামের (আইইএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এলএনজির বৈশ্বিক বাণিজ্য গত বছর রেকর্ড স্পর্শ করেছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে জ্বালানিটির বাণিজ্য আরো ২৫ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে জ্বালানিটির বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫০ কোটি টনে। 

এলএনজি সবচেয়ে শীতল প্রাকৃতিক গ্যাস, যেটি বিশেষ ধরনের ট্যাংকারে জাহাজীকরণ করা হয়। বিশ্বজুড়ে সরবরাহকৃত গ্যাসের ১৫ শতাংশই এলএনজি। পাইপলাইন গ্যাসের তুলনায় এলএনজি পরিবহন অনেক বেশি সহজ। প্রাকৃতিক গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে অনেক দূর পর্যন্ত পরিবহন করা যায়। এটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহযোগ্য, পাইপলাইনের মাধ্যমে যা সম্ভব নয়। এলএনজির আরেকটি বড় সুবিধা এটি মুক্তবাজারে সহজেই বিপণন করা যায়।