চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি পণ্যের বেশির ভাগই কনটেইনারে করে রেলপথে পরিবহন করেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দেশের একমাত্র ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো কমলাপুর আইসিডিতে অপারেটরদের লোড-আনলোডের ক্ষেত্রে ধীরগতিতে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। 

নানা সংকটে এমনিতেই দেশে আমদানি পণ্যের সরবরাহ তুলনামূলক কম। এতে রেলওয়ের চট্টগ্রাম পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) আমদানি পণ্য স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনারবাহী ট্রেন নিয়ে যাওয়ার পর সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে ছয় থেকে সাত গুণ বেশি সময় নিয়ে আনলোড করছে বন্দরে নিয়োজিত অপারেটররা। ফলে লোডিং কার্যক্রমও বিলম্বিত হচ্ছে। যার কারণে রেলওয়ে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক তিনটি কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা করলেও সেটি এখন নেমে এসেছে একটিতে। এতে রেলের রাজস্ব আয়, জনবল ও জ্বালানি খাতে লোকসান ছাড়াও ট্রেন অপারেটিংয়ে শিডিউল বিপর্যয় মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

এ বিষয়ে একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে তাড়া দেয়া হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বরং নিয়মিত ট্রেন সংখ্যা কমে আসায় সিজিপিওয়াই-তে কনটেইনারের জট ৮০০ ছাড়িয়েছে। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানি করলেও যথাসময়ে তা ঢাকায় পৌঁছাতে না পারায় ঈদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি-রফতানি পণ্যের স্বাভাবিক মুভমেন্টের প্রয়োজনে রেলওয়ে সবসময় কনটেইনার পরিবহনকে প্রাধান্য দেয়। সম্প্রতি রেলওয়ে কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রমকে আরো বেশি অগ্রাধিকার দিলেও লোড-আনলোড কার্যক্রমে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় রেলওয়ে সংকটে পড়েছে। আমরা এ সংকট নিরসনে বন্দরের পরিবহন (ট্রাফিক) বিভাগকে জানিয়েছি। দ্রুত এ ধরনের জটিলতা নিরসন করা না হলে দেশীয় আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পাশাপাশি রেলওয়ের পরিবহন কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটবে।’ 

ঢাকা আইসিডিতে রেলের দুটি লাইন রয়েছে। একটিতে কনটেইনারবাহী ট্রেন প্রবেশের পর অপর লাইনে হ্যান্ডলিং ক্রেন গিয়ে ট্রেন থেকে কনটেইনার নিয়ে তা আইসিডির ভেতরে আনলোড করে। ওই সময়ে আইসিডি এলাকার দুটি লাইনই ব্লক থাকে। স্বাভাবিক সময়ে একটি কনটেইনার ট্রেনের লোড-আনলোড সম্পন্ন করতে সময় লাগত সর্বনিম্ন ৩ ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ৫-৬ ঘণ্টা। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ঢাকা আইসিডিতে কনটেইনার লোড-আনলোডে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৭-১৮ ঘণ্টা বাড়তি সময় নিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে করে রেলের অপর কনটেইনার ট্রেনগুলো আইসিডিতে যেতে না পেরে তেজগাঁওসহ বিভিন্ন সাইডলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এতে রেলের জনবলের বাড়তি ব্যয় ছাড়াও বাড়তি জ্বালানিসহ দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন আটকে থাকায় বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে রেলওয়ে। 

বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার তাড়া দেয়া সত্ত্বেও এ সংকট সমাধান করতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ১০ মার্চ রেলওয়ের পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি একটি কনটেইনার ট্রেনের লোড-আনলোড সম্পন্ন করতে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট অতিরিক্ত সময় নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ৩ হাজার সিরিজের ৩০২৮ ইঞ্জিন নিয়ে ৬০৩ নং ট্রেনটি ওইদিন সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে আইসিডি লাইনে প্রবেশ করে। ১ মার্চ সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কনটেইনার নিয়ে আইসিডি ছেড়ে এটি চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে। অপরদিকে ৬ মার্চ ৩০১১ সিরিজের ইঞ্জিনে যাওয়া কনটেইনার ট্রেনটি ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে আইসিডিতে গেলেও স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ ঘণ্টা বাড়তি সময় ব্যয় করে লোড-আনলোড সম্পন্ন করতে। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ে থাকা ২০০ থেকে ২৫০ কনটেইনারের স্থলে গত ২ মার্চ বন্দর ইয়ার্ডে কনটেইনার মজুদের সংখ্যা বেড়ে ৮৩১টিতে উন্নীত হয়। এতে করে গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ কনটেইনার জট দেখা দেয়। 

চট্টগ্রাম বন্দরকে দেয়া চিঠিতে রেলওয়ে দাবি করেছে, ঢাকা আইসিডিতে লোড-আনলোডে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের লায়িং বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিজিপিওয়াই হতে প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি কনটেইনার ট্রেন চালানো হলেও বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে এক থেকে দুটিতে। সময়ক্ষেপণের ফলে রিসিপশন লাইনের অভাবে পথিমধ্যে কনটেইনার ট্রেন দীর্ঘ সময় বিলম্ব করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমদানি ও রফতানিকারকরা রেলপথে কনটেইনার পরিবহনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে সামগ্রিক বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার লোড-আনলোডে সময়ক্ষেপণের বিষয়টি স্বীকার করলেও বন্দরের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বন্দরের পরিবহনের (ট্রাফিক বিভাগ) একজন পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি। আশা করি, ঈদের পর ঢাকা আইসিডিতে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করে কনটেইনার লোড-আনলোড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক অবশ্য রেলওয়ের অভিযোগের বিষয়ে একমত নন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অপারেটরের কোনো গাফিলতি নেই। বরং বন্দরের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে পর্যাপ্ত ওয়াগন সরবরাহ দিতে পারেনি। রেলের দুর্ঘটনার কারণে শিডিউল বিপর্যয়ে কিছু কনটেইনার আটকে ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে।’