মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের খরচ দ্রুত বাড়ছে। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পণ্য পরিবহনের ভাড়া এখন করোনাকালীন রেকর্ডের কাছাকাছি। জ্বালানির দাম আরো বাড়লে এ পথে কনটেইনার পরিবহন খরচ নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।

পণ্য পরিবহনের আন্তর্জাতিক ভাড়া নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান জেনেটার তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার পাঠানোর স্পট রেট বা সাময়িক ভাড়া এখন ১০ হাজার ৯৪৮ ডলার। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এ ভাড়া বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।

সাংহাই থেকে নিউইয়র্ক সমুদ্রপথ বিশ্বের ব্যস্ততম কনটেইনার বাণিজ্য পথগুলোর একটি। বড় জাহাজ কোম্পানিগুলোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক একটি রুট। এমএসসি, মায়ের্স্ক, কসকো ও সিএমএ সিজিএমের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানি এ পথে নিয়মিত পণ্য পরিবহন করে।

জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, ‘এ পথে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া করোনাকালে পৌঁছানো সর্বোচ্চ দামের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সাংহাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৯০০ ডলারে উঠেছিল।’

বর্তমানে পরিবহন ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ জাহাজের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলায় হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ডুবে গেছে। অন্যদিকে বিমান হামলার পর সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট অয়েল পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণা করে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। এ পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে জাহাজের জ্বালানির দামেও।

কনটেইনার জাহাজে ব্যবহৃত খুবই কম সালফারযুক্ত জ্বালানি তেলকে ‘ভেরি লো সালফার ফুয়েল অয়েল’ বা ভিএলএসএফও বলা হয়। জাহাজ পরিচালনার খরচের বড় একটি অংশ এ জ্বালানির পেছনে যায়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে জাহাজ কোম্পানিগুলোও পরিবহন ভাড়া বাড়াতে পারে।

সামুদ্রিক জ্বালানির মূল্য প্রকাশকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান শিপ অ্যান্ড বাংকারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বন্দরের গড় ভিএলএসএফওর দাম বেড়ে গত বৃহস্পতিবার প্রতি টন ৯০১ ডলার ৫০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, এ দাম ছিল ৫৪৩ ডলার ৫০ সেন্ট। জাহাজ মালিকরা তেলের এ বাড়তি খরচ সামাল দিতে আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের ওপর বাড়তি মাশুল বা সারচার্জ চাপিয়ে দিচ্ছেন। ফলে পণ্য পরিবহনের মোট খরচ হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে।

পিটার স্যান্ড জানান, জাহাজের জ্বালানির দাম বাড়ায় জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত মাশুলও বাড়ছে। ফলে করোনাকালে দেখা সর্বোচ্চ পরিবহন ভাড়া ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেপ্টেম্বরেই এ নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

এর পেছনে ব্যবসায়িক কারণ হিসেবে কাজ করছে চীনের গোল্ডেন উইকের ছুটি। অক্টোবরের শুরুতেই চীনে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক এ ছুটি। এ ছুটির সময় দেশটির অধিকাংশ শিল্প-কারখানা ও উৎপাদন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। তাই ছুটির আগে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করেন। ওয়ালমার্ট ও অ্যামাজনের মতো বড় রিটেইল বা খুচরা বিক্রেতারাও চীন থেকে পণ্য আমদানি করতে পারে। এতে কনটেইনারের চাহিদা বাড়বে এবং পরিবহন ভাড়ার ওপর আরো চাপ তৈরি হতে পারে।

ব্রিটিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রিউরির ওয়ার্ল্ড কনটেইনার ইনডেক্সেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহে সাংহাই থেকে নিউইয়র্কে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার পাঠানোর স্পট রেট প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার ৩৯৪ ডলারে উঠেছে।

ড্রিউরি মনে করছে, গোল্ডেন উইকের আগে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণে এ পথে ভাড়া আরো বাড়তে পারে। তবে জেনেটা ও ড্রিউরির হিসাব পদ্ধতি এক নয়। তাই তাদের প্রকাশিত ভাড়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

করোনাকালে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছিল। তখন কনটেইনারের সংকটের পাশাপাশি পণ্যের চাহিদাও বেড়ে যায়। ঘরে থাকা মানুষ আসবাব, বড় টেলিভিশন ও ব্যায়ামের সরঞ্জামের মতো পণ্য বেশি কিনেছিলেন। ফলে সাংহাই-নিউইয়র্ক পথে কনটেইনার ভাড়া ড্রিউরির হিসাবে ১৬ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বেশি থাকলে জাহাজ পরিচালনার ব্যয়ও বাড়বে। একই সময় গোল্ডেন উইকের আগে চীন থেকে পণ্য পাঠানোর চাপ বাড়লে কনটেইনারের চাহিদা আরো বাড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের খরচ নতুন রেকর্ডে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।