দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি খাত পাট ও পাটজাত পণ্যের দৈন্য দশা দীর্ঘদিনের। তারই ধারাবাহিকতায় কমছে রফতানিও। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত (১১ মাস) রফতানি কমেছে ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা একই সময়ে রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত পাট এবং পাটজাত পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৯৩ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু এ সময় রফতানি হয়েছে প্রায় ৭৯ কোটি মার্কিন ডলার, যা এর আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৫ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ তথ্য জানিয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে পাট ও পাটজাত পণ্য ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো সুখবর নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আব্দুল বারিক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা তো ঋণই পাই না। সরকার তৈরি পোশাক খাতে সহজ শর্তে ৩ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংক সেখানে বছরে চার্জ করে। আর আমাদের ১১-১২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। সেটি এখন আবার বাড়ানো হয়েছে। আমাদের সুদ চার্জ করে প্রতি তিন মাসে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা, তাদের তুলনায় আমাদের মেশিনারিজ অনুন্নত।’
আব্দুল বারিক খান আরো বলেন, ‘পাট পণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চিঠি দিয়ে নির্দেশনাও দিয়েছেন। কিন্তু আমলারা সেটি এখনো করেননি। ফলে আমরা বেশকিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এতে করে এ খাতের ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।’
বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যে আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাঁচ বছর বৃদ্ধি করে ভারত। বিজ্ঞপ্তির নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশের উৎপাদকদের পাটপণ্য রফতানিতে ভিন্ন ভিন্ন হারে শুল্ক প্রযোজ্য হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে (যদি না এ সময়ের আগে তা প্রত্যাহার, বাতিল বা সংশোধন করা হয়) কার্যকর হবে এ শুল্ক, যা ভারতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতি টনে ১৯ দশমিক ৩০ থেকে ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে ভারত। ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন আগে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন করে মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর ফলে দেশটিতে বাংলাদেশের পাটপণ্য রফতানি কার্যত শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।
রফতানির ক্ষেত্রে আরো কিছু জটিলতার বিষয় উল্লেখ করে আব্দুল বারিক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে সেখানে আমরা বাজার হারিয়েছি। অন্যদিকে আমরা বহুবার সরকারকে বলে আসছি সমুদ্র পথে পাট পণ্য রফতানির পথ সহজ করতে, দেশগুলোর সঙ্গ কথা বলতে। কিন্তু সেটি না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবহন খরচ এবং ট্রাকের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন মত। অনেক সময় দেখা যায় আমরা পাঠাই ১৫ ট্রাক কিন্তু তারা বলে ৫ ট্রাক, ১০ ট্রাক। তখন আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। কিন্তু এটা যদি সমুদ্র পথে যেত, তাহলে এসব করার সুযোগ থাকত না।’
পাট ও তুলার মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে সুতা (ভেসিকল)। পাট কাটিংস ও নিম্ন মানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারকেলের ছোবড়া মিশিয়ে জুট জিওটেক্সটাইল উৎপন্ন হয়। তাছাড়া পাটখড়ি থেকে উৎপাদিত ছাপাখানার বিশেষ কালি, চারকোল এবং পাট পাতা থেকে উৎপাদিত ভেষজ পানীয় রফতানি পণ্য হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বাহারি ব্যাগ, খেলনা, শো-পিস, ওয়ালমেট, আলপনা, দৃশ্যাবলি, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, শিঁকা, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার পর্দার কাপড়, গহনা ও গহনার বাক্সসহ নানা পণ্য। এ ধরনের ২৩৫ রকমের আকর্ষণীয় ও মূল্যবান পণ্য জাহাজে চড়ে বিদেশে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এমনকি বাংলাদেশের পাট এখন পশ্চিমা বিশ্বের গাড়ি নির্মাণ, পেপার অ্যান্ড পাল্প, ইনসুলেশন শিল্প, জিওটেক্সটাইল হেলথ কেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিকস, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১০২ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থবছর শেষে হওয়ার ঠিক আগের মাসে নেতিবাচক রফতানির ফলে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
সরকারের নীতিসহায়তা না পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোর ফলে পাট ও পাটজাত পণ্যে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।










