বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট এবং ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার জেরে দীর্ঘ সময় ধরেই বাড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম। এ ধারাবাহিকতায় গত মাসে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। আকাশচুম্বী দাম অঞ্চলটির জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। স্থিতি ফিরছে এশিয়ার এলএনজি বাজারে। এ অঞ্চলে টানা তিন সপ্তাহের মতো কমেছে জ্বালানি পণ্যটির দাম।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এলএনজি আমদানিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপ ও এশিয়া। ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় এশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতা শিথিল হয়েছে। বিষয়টি দরপতনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। যদিও পাকিস্তান ও তুরস্কে নতুন করে বেড়ে যাওয়া চাহিদা এতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, অক্টোবরের শুরুর দিকে এশিয়ায় নভেম্বরের প্রথমার্ধে সরবরাহের জন্য চুক্তি করা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৩৪ ডলারের কিছু বেশিতে উন্নীত হয়। এক মাসের ব্যবধানে দাম বাড়ে ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৩৬ ডলারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ক্রয় করে। আকাশচুম্বী দামের কারণে ক্রেতারা যখন সরবরাহ নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন তখনই এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম ৩০ ডলারের নিচে নেমেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডিসেম্বরে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় সরবরাহের জন্য চুক্তি করা এলএনজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ৫ শতাংশ বা ১ ডলার ৫০ সেন্ট কমেছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম দাঁড়িয়েছে ২৯ ডলার ৫০ সেন্টে।
এদিকে টানা পাঁচদিন বন্ধ থাকার পর চলতি সপ্তাহে ইয়ামাল পাইপলাইনের মাধ্যমে আবারো ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে রাশিয়া। ফলে ইউরোপে গ্যাসের পাইকারি দাম কমে গিয়েছে। এছাড়া স্পট মার্কেটের মাধ্যমে ওমান ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলটিতে এলএনজি বিক্রি করছে। ফলে বাড়ছে সরবরাহ।
জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার হুইটস্টোন এলএনজি প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে। বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশটি থেকে কোম্পানিটির এলএনজি রফতানি বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিতে প্রতিদ্বন্দ্বী অঞ্চল দুটির মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফ্রিপোর্ট এলএনজি প্লান্টে ফিডগ্যাসের (এলএনজিতে রূপান্তরের জন্য সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মজুদ রেকর্ড সর্বনিম্নে পৌঁছে। এ কারণে এশিয়ার বাজারে অস্থিতিশীলতার উদ্বেগ এখনো রয়ে গিয়েছে। এদিকে আসন্ন শীতে সরবরাহ সমুন্নত রাখতে চীনের ক্রেতারা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ফলে স্পট মার্কেটে চাহিদা আরো জোরদার হতে পারে। এরই মধ্যে পাকিস্তান চলতি মাসে সরবরাহের জন্য জরুরি দরপত্রের মাধ্যমে দুই কার্গো এলএনজি আমদানি করতে যাচ্ছে। তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি বোটাস ডিসেম্বর এবং আগামী বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সরবরাহের জন্য নয় কার্গো এলএনজি আমদানি করতে যাচ্ছে। থাইল্যান্ডের বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক কার্গো এলএনজি ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করে। শীতে সরবরাহের জন্য দেশটির হোক্কাইডো গ্যাসও এক কার্গো এলএনজি আমদানি করতে যাচ্ছে। এশিয়ায় চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশি দিন স্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
রেফিনিটিভ ইকনের তথ্যমতে, দুই সপ্তাহের মধ্যেই সিউল, বেইজিং ও সাংহাইয়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের অনেক নিচে নেমে যাবে। এটি জ্বালানি পণ্যটির চাহিদাকে আরো এক ধাপ সামনে নিয়ে যেতে পারে। সূত্র: রয়টার্স










