নরওয়ের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর ফলপ্রসূ আলোচনার পরই দেশটিতে শ্রমিক ধর্মঘটের সমাপ্তি ঘটেছে। ধর্মঘটের কারণে দেশটিতে আগামী এক সপ্তাহে তেল ও গ্যাসের উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যদিও ধর্মঘট সমাপ্তির মধ্য দিয়ে সেই অচলাবস্থারও সমাপ্তি ঘটল। খবর রয়টার্স ও ইয়াহু ফাইন্যান্স।
নরওয়ের এ ঘটনার পর এখন আলোচনায় শ্রমিকদের বেতন, বোনাস। তেল ও গ্যাস খাতে আকর্ষণীয় বেতনের সুযোগ রয়েছে বলেই সবার ধারণা। যদিও এ বেতন একেক দেশে একেক রকম। এটা নির্ভর করে দেশ ও জ্বালানি ফার্মের নীতি ও সক্ষমতার ওপর। আবার অনেক ক্ষেত্রে এটা কম-বেশি হয় শ্রমিক ইউনিয়নের দরকষাকষি করার সামর্থ্যের ওপর।
পারিশ্রমিক বৃদ্ধির দাবিতে সদ্যই আন্দোলন করা নরওয়েজিয়ান শ্রমিকরা ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ আর্থিক সুবিধা পান, এমনকি লাতিন আমেরিকান শ্রমিকদের প্রায় দ্বিগুণ অর্থ পান তারা। কিন্তু এর পরও অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রর জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের তুলনায় নরওয়েজিয়ানরা অনেক কম পান!
নরওয়ের শ্রমিকদের বেতন কত?
নরওয়ের পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে দেশটির তেল ও গ্যাস খাতের পূর্ণকালীন কর্মীরা গড়ে বার্ষিক ১ লাখ ডলার বা ৯ লাখ ৩০ হাজার ক্রোনা বেতন পান। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ভাতা ও বোনাস, আর ওভারটাইম এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
জ্বালানি কোম্পানিগুলো এ বছর যে প্রস্তাব দেয় তা প্রত্যাখ্যান করে বর্ধিত পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ধর্মঘটের ডাক দেয় নরওয়ের শ্রমিক ইউনিয়ন লেদের্নে। এছাড়া অফশোর রিমোট কন্ট্রোল রুম ও অফশোর কর্মীদের জন্যও সমান পারিশ্রমিক ও শর্তের দাবি তোলে শ্রমিক ইউনিয়ন।
লেদের্নের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে নরওয়ের তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকরা ৯ লাখ ১৫ হাজার ক্রোনা বা ৯৮ হাজার ডলার পারিশ্রমিক পান। এ হিসাবে, নরওয়ের অন্য শিল্প খাতের শ্রমিকদের তুলনায় তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকরা প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি আয় করেছেন।
ওয়েল্ডার্স, ইঞ্জিনিয়ার্স, রিগার্স
রিস্তাদ এনার্জি প্রদত্ত তথ্যমতে, তেল খাতের প্রকৌশলী ও ওয়েল্ডাররা যুক্তরাজ্য কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মীদের তুলনায় অনেক বেশি বেতন পান। নরওয়েতে তেল প্রকৌশলীদের গড় বেতন ঘণ্টাপ্রতি ৫০ ডলার, যুক্তরাজ্যে যা ৩০ ডলার, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে আবার এ বেতন ৬০ ডলার।
নরওয়ের ওয়েল্ডাররা ঘণ্টায় নেন ৩০ ডলার করে, যা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে বেশি। নরওয়েতে রিগাররা ঘণ্টায় পান ৩০ ডলারের কম, যা যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সমান।
পারিশ্রমিকে শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও এর পার্শ্ববর্তী দ্বীপদেশের তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকরা বিশ্বে সবচেয় বেশি পারিশ্রমিক পান। শ্রমিকসংশ্লিষ্ট ফার্ম ‘এয়ারসুইফট’-এর গ্লোবাল এনার্জি ট্যালেন্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২০-এর তথ্যমতে, এ অঞ্চলে তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকরা বছরে গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পারিশ্রমিক পান।
এ খাতে উত্তর আমেরিকার শ্রমিকরা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পান। তাদের বার্ষিক গড় বেতন ১ লাখ ১২ হাজার ডলার, ইউরোপে যা ৮২ হাজার ৫০০ ডলার। তেল ও গ্যাস খাতে লাতিন আমেরিকান শ্রমিকরা বছরে পান ৪৮ হাজার ডলার করে, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্নসারির।
ইউনিয়নের প্রভাব
রিস্তাদ এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ফিটসিমন্স বলেন, ‘বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকদের বেতনের ওপর বড় প্রভাব রাখে আঞ্চলিক ইউনিয়নগুলো। উদাহরণস্বরূপ, যখন যুক্তরাষ্ট্রে তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকদের বেতন কমে যায়, তখন কানাডায় এটা স্থিতিশীল থাকে, কেননা ওই দেশটির ইউনিয়ন এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।’
বেতনের ওপর মুদ্রার প্রভাব
নরওয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নরওয়ের তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিকদের বেতন ১০ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপের মধ্যে নরওয়ের শ্রমিকদের বেতন সর্বোচ্চ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের তুলনায় এ অঞ্চলের অন্য দেশের শ্রমিকদের বেতন বেশি বেড়েছে। এটা হয়েছে মূলত ডলারের তুলনায় নরওয়ের ক্রোনার মূল্যমান হ্রাসের কারণে।
২০১৪ সালে তেলের দরপতন ঘটেছিল, সেই থেকে এখন পর্যন্ত ডলারের তুলনায় ক্রোনার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছে ৫০ শতাংশ।










