নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খলে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। মহামারীর ফলে দেশে দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক দেশই খাদ্যপণ্যের রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে বা কোটা বেঁধে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও কাজাখস্তানের মতো শীর্ষ শস্য রফতানিকারকরা এ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে এসব দেশের শস্যে সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা গভীর হচ্ছে। তবে কি মহামারীর মধ্যে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ‘খাদ্য জাতীয়তাবাদ’
হিসেবে পরিচিত নীতিতে প্রত্যাবর্তন করেছে?
তবে এসব দেশের সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, কেবল অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষা ও খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতেই তারা এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
রাশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে রাশিয়ায় নভেল করোনাভাইরাস হানা দেয় এবং ভাইরাসটির আক্রমণে কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময় দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তীব্র হতে থাকে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করে খাদ্যপণ্যের দাম। এপ্রিলে আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশটিতে গমের মূল্য জ্বালানি তেলের মূল্যকে ছাড়িয়ে যায়। এপ্রিলে রাশিয়ার বাজারে প্রতি টন গমের মূল্য ১৩ হাজার ৩০০ রুবল বা ১৯৫ ডলারের রেকর্ড ছুঁয়ে যায়।
মস্কোভিত্তিক আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য ব্যবসা কোম্পানি এগ্রোজান কমোডিটিসের মহাপরিচালক সাবিনা সোদিকভা বলেন, ওই সময় খাদ্য নিরাপত্তা আশঙ্কার পাশাপাশি রুবলের দুর্বল বিনিময় হারও গমের দাম বাড়াতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া খাদ্যপণ্যটির দাম যেহেতু ক্রমেই ঊধ্বর্মুখী হচ্ছিল, কৃষকরা আরো ভালো দামের আশায় পণ্যটির মজুদ বাড়াতে শুরু করেছিলেন।
স্থানীয় কৃষকদের মজুদ বৃদ্ধির এ প্রবণতা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে গমের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এতে অবশ্য কৌশলগত কিছু ঝামেলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছিল। দেশব্যাপী কোয়ারেন্টিন চলমান থাকায় পণ্যটির স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছিল। এতে কৃষকদের আগামী মৌসুমের ফসল সংগ্রহের শুরুটা হতো শস্যপূর্ণ গুদাম নিয়ে।
এ পরিস্থিতিতে গমের ক্রমবর্ধমান মূল্যের লাগাম টানতে ও অভ্যন্তরীণ বাজারে শস্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য রফতানিতে নির্দিষ্ট কোটা বেঁধে দেয় রাশিয়া। এপ্রিল থেকে জুন অবধি মোট ৭০ লাখ টন শস্য রফতানির অনুমতি পান রাশিয়ার রফতানিকারকরা। তবে এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে গমের রফতানি চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছিল, মে মাসের মাঝামাঝিতে পণ্যটি রফতানির কোটা শেষ হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার ঘোষণা দেয়, নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোটা পূরণ হয়ে গেলে শস্য রফতানি বন্ধ করে দেবে রাশিয়া। তবে সরকারের বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও পণ্যটির রফতানি বাড়তেই থাকে। এর জের ধরে এপ্রিলের কয়েকদিন হাতে থাকতেই খাদ্যশস্য রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া।
২০১৯-২০ মৌসুমে (জুলাই-জুন) রাশিয়ায় মোট ১১ কোটি ৭ লাখ টন শস্য উৎপাদিত হতে পারে। দেশটিতে এ মৌসুমে খাদ্যশস্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৬ কোটি ৯৫ লাখ টন। মৌসুমের শুরু থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ৩ কোটি ২৪ লাখ টন শস্য রফতানি হয়েছে। দেশটির সরকারের সাম্প্রতিক রায় অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ মজুদ যদি ১ কোটি ৭৫ লাখ টনের নিচে নেমে আসে, তবে দেশটি ৪ কোটি ১৭ লাখ টনের বেশি শস্য রফতানি করবে না।
রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশ। রাশিয়ার ফেডারেল কাস্টমস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি থেকে সবচেয়ে বেশি গম আমদানি করে তুরস্ক, মিসর ও বাংলাদেশ। শস্য রফতানির এ নিষেধাজ্ঞা দেশটির এসব বাণিজ্য অংশীদারদের কতটা প্রভাবিত করবে, সে বিষয়ে রাশিয়ার সরকারি দপ্তর কোনো মন্তব্য এখনো অবধি করেনি।
এছাড়া রাশিয়ার বাইরে ইউরেশিয়ান ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানও শস্য রফতানিতে সীমা টেনেছে। কাজাখস্তান বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ময়দা রফতানিকারক দেশ এবং নিট শস্য রফতানিকারক। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্য সরবরাহে কিরগিজস্তানের অবস্থান প্রথম সারিতে। কাজাখস্তানের শস্য রফতানি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের খাদ্য শিল্পের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কেননা উভয় দেশের শস্য খাতে কাজাখস্তানের অবস্থান গুরুতর। উজবেকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশটি সব মিলিয়ে পাঁচ লাখ টন ময়দা ও ৩২ লাখ টন শস্য কাজাখস্তান থেকে আমদানি করেছিল, যা ছিল দেশটির অভ্যন্তরীণ মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে গত বছর দেশটি থেকে তাজিকিস্তান আমদানি করেছে ৫৬ হাজার টন ময়দা ও ১০ লাখ টন শস্য, যা দেশটির মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৬০ শতাংশ।
ফলে কাজাখস্তানের এ সিদ্ধান্তে উভয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। তবে এপ্রিলে শস্য রফতানিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, কিছুদিনের মধ্যেই তা তুলে নেয় দেশটি। এর পরিবর্তে খাদ্যশস্য রফতানিতে নির্দিষ্ট কোটা বেঁধে দেয় দেশটির সরকার। এর আওতায় দেশটির ব্যবসায়ীরা মাত্র দুই লাখ টন গম ও ৭০ হাজার টন ময়দা রফতানির অনুমতি পায়, যা দেশটির স্বাভাবিক রফতানির তুলনায় অনেক কম। কাজাখস্তান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে তিন লাখ টন গম ও ১ লাখ ২৩ হাজার টন ময়দা রফতানি করে থাকে।
এদিকে রাশিয়ার প্রতিবেশী ও ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ শস্য রফতানিকারক দেশ ইউক্রেনও অতিরিক্ত শস্য রফতানি রুখতে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। স্থানীয় কৃষিপণ্যবিষয়ক কোম্পানি কিয়েভলেবের পরিচালক ভ্লাদিমির চেরেদা বলেন, মহামারী প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই শস্যের রফতানি চাহিদা বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারেও খাদ্যপণ্য ক্রয় বাড়িয়েছেন ভোক্তারা। এদিকে পরিস্থিতি বুঝে কৃষকরা বাজারে শস্য সরবরাহ কমিয়ে মজুদে ঝুঁকেছেন। এতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দেশটিতে শস্যের দাম হু হু করে বাড়ছে।
এরই মধ্যে ইউক্রেনে গমের দাম আগের তুলনায় ১৮ ডলারের বেশি বেড়েছে। ফলে রুটির দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অবধি। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির শিল্প খাতের সঙ্গে জড়িতরা গম রফতানি বন্ধের জন্য সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছেন। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী তারাস ভিসোতস্কি তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, নভেল করোনাভাইরাস প্রকোপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ চক্র স্বাভাবিক রাখতে গমের অতিরিক্ত রফতানি রুখতে দেশটির সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
ওয়ার্ল্ডগ্রেইনডটকম ও এগ্রিমানি অবলম্বনে










