২০২৭ সালের মধ্যে বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পাশাপাশি ২০টি দেশের ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে নেটওয়ার্ক বিস্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে শুধু বহর ও রুট সম্প্রসারণ নয়, বিমান পরিবহন খাতের বিভিন্ন সহায়ক সেবা এবং অবকাঠামোকে সমন্বিত করে একটি শক্তিশালী বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় ইউএস-বাংলা।

পরিকল্পিত ২১টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে বোয়িং ৭৩৭-৮ ও বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ধরনের আধুনিক সরু-দেহের উড়োজাহাজ। নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। স্বল্প ও মধ্যপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এসব উড়োজাহাজ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজের জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও পরিচালন দক্ষতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও সুবিধা দিতে পারে।

তবে নতুন উড়োজাহাজের সুফল পেতে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, উপযুক্ত রুট নির্বাচন, বিমানবন্দরের উড্ডয়ন-অবতরণ সময়সূচি, যাত্রী চাহিদা ও পরিচালন দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন হবে। নতুন উড়োজাহাজকে কেন্দ্র করে সমন্বিত রুট ও পরিচালন কৌশল বাস্তবায়নকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ইউএস-বাংলা।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার মতো দূরপাল্লার বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন গন্তব্য নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ভ্রমণ চাহিদা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, পর্যটন, ধর্মীয় ভ্রমণ ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু, কলম্বো, কাঠমান্ডু ও পেনাংয়ের মতো গন্তব্যে আলাদা সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, দাম্মাম ও মদিনাও বাংলাদেশের বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় পর্যটকদের কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক রুট চালুর ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি, যাত্রী পরিবহনের অধিকার, বিমানবন্দরের উড্ডয়ন-অবতরণ সময়সূচি, ভূমিসেবা, উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং রুটের আর্থিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারের বড় একটি অংশ বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর দখলে। ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য দেশের বাইরে চলে যায়। শক্তিশালী বাংলাদেশী বিমান পরিবহন সংস্থা গড়ে উঠলে এ অর্থপ্রবাহের একটি অংশ দেশের অর্থনীতিতে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, সময়নিষ্ঠতা, আধুনিক উড়োজাহাজ, বিস্তৃত গন্তব্য নেটওয়ার্ক ও উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউএস-বাংলার সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য একটি শক্তিশালী দেশীয় বিকল্প তৈরি করা, যাতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে তারা নিজ দেশের বিমান সংস্থাকে বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

ইউএস-বাংলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি আধুনিক বিমান সংস্থার সঙ্গে শুধু উড়োজাহাজ নয়, বৈমানিক, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞ, ভূমিসেবা কর্মী, বিমান পরিবহন ব্যবস্থাপক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল যুক্ত থাকে। এ বাস্তবতায় বিমান পরিবহন প্রশিক্ষণ, বৈমানিক ও কেবিন ক্রু উন্নয়ন, প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ, ভূমিসেবা, কার্গো, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইউএস-বাংলা। লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বিমান সংস্থার পাশাপাশি বিমান পরিবহন শিল্পের বিভিন্ন সহায়ক খাতও একই ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠবে।

২১টি নতুন উড়োজাহাজ ও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বিপুল দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন হবে। বৈমানিক, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, ভূমিসেবা কর্মী ও বিমান পরিবহন ব্যবস্থাপনা পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে দেশে বিমান পরিবহন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো শক্তিশালী করাও জরুরি হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ বাড়ানো গেলে শুধু ইউএস-বাংলা নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক বিমান পরিবহন খাতও উপকৃত হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের রফতানিমুখী অর্থনীতি—বিশেষত তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য এবং দ্রুত বাড়তে থাকা অনলাইন-বাণিজ্যিক বিমান কার্গোর জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দ্রুত কার্গো ব্যবস্থাপনা, শীতল সংরক্ষণ, দক্ষ কাস্টমস ছাড়পত্র, কার্গো টার্মিনাল ও বিমানবন্দরভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। ইউএস-বাংলা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কার্গো ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকেও বিবেচনা করছে।

একই সঙ্গে ঢাকা-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বাইরে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আরো সরাসরি আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে যাত্রীদের সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরে অভিবাসন, শুল্ক, ভূমিসেবা, উড্ডয়ন-অবতরণ সময়সূচি ও অন্যান্য পরিচালন সুবিধা শক্তিশালী করতে হবে।

বহর যত বড় হবে, পরিচালন ব্যবস্থার জটিলতাও তত বাড়বে। তাই উড়োজাহাজ সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্কৃতি শক্তিশালী করাকে অপরিহার্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, বৈমানিক ও কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল মান, পরিচালন পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি অনুসরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে।

ভবিষ্যতের বিমান পরিবহন শিল্প আরো প্রযুক্তিনির্ভর হবে। অনলাইনে টিকিট বুকিং, মোবাইলভিত্তিক গ্রাহকসেবা, স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন, উড্ডয়নের তাৎক্ষণিক তথ্য, ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ও যাত্রীভিত্তিক সেবা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই টিকিট বুকিং থেকে বিমানবন্দর এবং উড়োজাহাজ থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বেসরকারি বিমান সংস্থার সম্প্রসারণ শুধু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না। বিমানবন্দর অবকাঠামো, বিমান জ্বালানির মূল্য, কর, বিমানবন্দর ব্যবহারের খরচ, উড্ডয়ন-অবতরণ সময়সূচি, নিয়ন্ত্রক সমন্বয় ও দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তিও ব্যবসায়িক সাফল্যের ওপর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ বিনিয়োগের জন্য নীতিমালার স্থিতিশীলতা তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনাও প্রয়োজন।