ভারত ও মালয়েশিয়ার মধ্যে চলমান বিরোধের শুরুটা মূলত রাজনৈতিক। তবে রাজনীতি ছাপিয়ে এ বিরোধে বড় একটি জায়গা করে নিয়ে পণ্যবাজার। বিরোধের জের ধরে মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে মালয়েশিয়ার বর্তমান সরকার বিরোধ নিরসনে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারত থেকে বাড়তি চাল আমদানি করতে যাচ্ছে কুয়ালালামপুর। সব মিলিয়ে ভারত-মালয়েশিয়ার চলমান বিরোধ নিরসনে অন্যতম দুটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে পাম অয়েল ও চাল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুটো উদ্যোগ মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিরোধের সূচনা করে। একটি ভারতের আলোচিত-সমালোচিত নাগরিকত্ব বিল। অন্যটি ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা খর্ব করা। নরেন্দ্র মোদি যখন এ দুটো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন, তখন মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায় ছিলেন বর্ষিয়ান রাজনীতিক মাহাথির মোহাম্মদ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথির ভারত সরকারের এ দুটি উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন। তার দাবি, মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে নরেন্দ্র মোদি ভারতে এ ধরনের সমালোচিত উদ্যোগ নিয়েছেন।


মাহাথিরের একের পর এক ভারত সরকারবিরোধী মন্তব্যের প্রতিবাদ করে নয়াদিল্লি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মোদির এসব উদ্যোগ একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই এসব বিষয়ে ভিনদেশী সরকারপ্রধানের তির্যক মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য ও গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ভারত সরকারের এমন অবস্থানের পরও থামেননি মাহাথির। মোদির উদ্দেশে একের পর এক সমালোচনার তীর ছুড়েছেন।

স্বাভাবিকভাবেই এ ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যা এখনো চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে মালয়েশিয়ার মসনদে পালাবদল ঘটেছে। ক্ষমতা থেকে সরে গেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। মালয়েশিয়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মুহিউদ্দিন ইয়াসিন। তিনি ক্ষমতায় এসেই মাহাথির সরকারের অবস্থান থেকে সরে এসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছেন। তবে দুই দেশের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার পথে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন এখনো চোখে পড়েনি। 

ভারত ও মালয়েশিয়ার এ বিরোধ প্রধানত রাজনৈতিক। তবে শুরু থেকেই পণ্যবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। ভারত মালয়েশীয় পাম অয়েলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। বিরোধের জের ধরে মালয়েশিয়া থেকে পণ্যটির আমদানি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনে নয়াদিল্লি। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি বাড়ানো হয়। ইন্দোনেশিয়ার পর মালয়েশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ পাম অয়েল উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ। দেশটির রফতানি আয়ের বড় একটি অংশ আসে পাম অয়েল থেকে। বিরোধের জের ধরে অন্যতম শীর্ষ রফতানি গন্তব্য ভারতে বাজার হিস্যা হারিয়ে পণ্যটির রফতানি কাতে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে মালয়েশিয়া।


এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বড় একটি ধাক্কা দিয়ে ভারত সরকার। সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে মালয়েশীয় পাম অয়েল আমদানি কমিয়ে এনেছিলেন ভারতীয় আমদানিকারকরা। ১১ মে পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোট ৩৯টি পাম অয়েল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থহিত করা হয়েছে। যদিও ভারত সরকার বলছে, অবৈধভাবে সস্তা পাম অয়েল আমদানি ঠেকিয়ে দেশীয় শিল্প রক্ষার জন্য এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগের পেছনে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চলমান বিরোধ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়াকে বাণিজ্যিক সবক দিতে চাইছে নয়াদিল্লি।

এ তো গেল দিল্লির পক্ষ থেকে বিরোধ জিইয়ে রাখার কৌশল। তবে মালয়েশিয়ার নতুন সরকার শুরু থেকেই বিরোধ নিরসনে বদ্ধপরিকর। তারা আগের সরকারের আমলের এ বিরোধের জের জিইয়ে রাখতে নারাজ। কেননা পাম অয়েল মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য। আর চলমান বিরোধে রফতানিমুখী এ খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর এ সময়ে পতনের মুখে থাকা মালয়েশীয় অর্থনীতি এ বিরোধের জেরে আরো চাপে পড়েছে। এজন্য বরাবরই মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। যদিও এসব উদ্যোগের ফলাফল প্রশ্নসাপেক্ষ।

সর্বশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া সরকার ভারত থেকে চাল আমদানির চিন্তা করেছে। এর অংশ হিসেবে ভারতীয় রফতানিকারকদের কাছ থেকে মালয়েশিয়ার আমদানিকারকরা প্রাথমিকভাবে এক লাখ টন চাল কিনবেন। চলতি মাসে কিংবা পরের মাসে আমদানি করা এসব চাল মালয়েশিয়ায় পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকারের সূত্র জানিয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীর মাঝে মালয়েশিয়ায় চালের চাহিদা বেড়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ত্রাণ কার্যক্রমে চাল দেয়া হচ্ছে। এ সময় মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া খাদ্যপণ্যটির রফতানিতে লাগাম টেনেছে। ফলে বিকল্প উৎস হিসেবে ভারত থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চাল আমদানির মাধ্যমে নয়াদিল্লির সঙ্গে বিদ্যমান শীতল সম্পর্ক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর কুয়ালালামপুর। এতে দুটো লাভ হবে। প্রথমত, তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় চাল আমদানির সুযোগ পাবেন মালয়েশীয় আমদানিকারকরা। দ্বিতীয়ত, চাল আমদানির মাধ্যমে শীতল সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হলে ভারতের বাজারে পাম অয়েল রফতানি বাড়ানোর পথ খুঁজবেন মালয়েশীয় রফতানিকারকরা। যদিও এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা।

ইন্ডিয়ান রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বিভি কৃষ্ণ রাও বলেন, দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়া ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছর দুই দেশের মধ্যকার চালের বাণিজ্য দ্বিগুণ বাড়তে পারে। আর কমে আসতে পারে দুই দেশের চলমান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ।

—রয়টার্স, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ইকোনমিক টাইমস অবলম্বনে