১৯৯৯ সালে প্রচলিত ধারার ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০২১ সালে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা করে। সম্প্রতি ২৮ বছরে পদার্পণ করা ব্যাংকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. সিদ্দিকুর রহমান। ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা কেমন?

তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে আমরা বর্তমানে ভালো অবস্থানে রয়েছি। ২৭ বছরের অর্জিত আস্থা ও সেবার ধারাবাহিকতায় আমাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের আমানত সাড়ে ২০ হাজার কোটি এবং বিনিয়োগ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পরিশোধিত মূলধন ও মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থান সন্তোষজনক। ব্যাংক খাতে নানা অস্থিরতার মাঝেও আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছি। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের পর আমাদের জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে।

ব্যাংকিং সেবা প্রদানে আপনাদের বিশেষত্ব কী?

আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গ্রাহককেন্দ্রিক ও শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং সেবা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি সমন্বয় করে গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ ও সহজ ব্যাংকিং নিশ্চিত করছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত ১৩৮টি শাখা ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এটিএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। পাশাপাশি ২৪/৭ কল সেন্টার, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘ডিজিব্যাংকিং’ ও এসএমএস সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা যেকোনো সময় ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। রেমিট্যান্স আহরণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আমাদের এক্সচেঞ্জ হাউজ কার্যক্রম রয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোক্তা, এসএমই ও করপোরেটসহ সব শ্রেণীর গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ভাবনী আর্থিক সমাধান দিচ্ছি।

দেশের ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট রয়েছে, গ্রাহক আস্থা ফেরাতে কেমন কর্মকৌশল হওয়া উচিত?

এটা সত্য যে বিগত কয়েক বছরে স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতায় দেশের ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক সবসময় গ্রাহকের স্বার্থ ও আস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। গ্রাহকের সন্তুষ্টি, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই আমরা আমাদের সেবার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকে আমানত উত্তোলনের চাপ দেখা গেলেও স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি; বরং আমাদের আমানত ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গ্রাহকদের দৃঢ় আস্থারই প্রতিফলন। ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার, ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং বিদ্যমান আইন-কানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার মাধ্যমেই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাশীল ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। শরিয়াহভিত্তিক ও সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ বরাবরই ইতিবাচক, যদিও গত কয়েক বছরে ইসলামী ধারার কিছু ব্যাংকে সুশাসন ও বিনিয়োগ শৃঙ্খলার ঘাটতিজনিত কারণে নানা সংকট তৈরি হয়েছে, যা জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তবে আমি মনে করি, এটি সাময়িক। সুদৃঢ় কাঠামো ও কল্যাণকামী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইসলামী ব্যাংকিং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ দেশেও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ছে। তবে শরিয়াহ নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ ও গ্রাহকসচেতনতা বাড়ার মতো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, ফিনটেক উদ্ভাবন ও নীতিগত উন্নয়নের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হবে বলে আমি মনে করি।

স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে আমানত সংগ্রহ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যাংকের মুনাফা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। চলতি বছরের মধ্যেই গুলশানে নিজস্ব হেড অফিসে কার্যক্রম শুরু, ‘ইসলামী’ শব্দ যোগে নতুন নাম ও লোগো উন্মোচন এবং সেবায় নতুনত্ব আনার মাধ্যমে ব্যাংকের ব্র্যান্ড ইমেজ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার, সিএমএসএমই খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত বিনিয়োগ আদায় জোরদারকরণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।