যশোরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে চলতি মৌসুমে সরিষা চাষ হয়েছে। স্বল্প সময়ে ভালো দাম পাওয়ায় বছর বছর বাড়ছে সরিষা আবাদি জমির পরিমাণ। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আবাদি জমি বেড়েছে দ্বিগুণ। কৃষক বলছেন, আমন ও বোরো ধান চাষের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে জেলার দুই ফসলি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষককে প্রণোদনাসহ নানা পরমর্শ দিচ্ছেন তারা।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় চলতি মৌসুমে ২৯ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও এরই মধ্যে তা ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ২৬৫ হেক্টরে। তথ্য বলছে, গত মৌসুমে (২০২২-২৩) ২৫ হাজার হেক্টর ও তার আগের মৌসুমে (২০২১-২২) ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করেছিলেন কৃষক। এ হিসাবে মাত্র তিন বছরের মাথায় যশোরে সরিষা আবাদি জমির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

সরজমিন দেখা যায়, জেলার সদর উপজেলার কচুয়া, চাঁচড়া, ফতেপুর, নওয়াপাড়া বিভিন্ন মাঠ এখন সরিষার হলুদ ফুলে ছেঁয়ে গেছে। আমন ধান ওঠার পর ও বোরো আবাদের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা চাষ করে কৃষক বাড়তি আয় করতে পারছেন। অন্যান্য শীতকালীন ফসলের চেয়ে সময় কম লাগায় ধান চাষ ব্যাহত না করেই ফসল ঘরে তুলতে পারেন সরিষা চাষীরা। তিন মাস মেয়াদি উচ্চ ফলনশীল বারি-৯ ও ১৪ জাতের সরিষা চাষ তাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানকার কৃষকের মাঝে। পাশাপাশি তেলবীজটি চাষে মিলছে সরকারি প্রণোদনাও। বিঘাপ্রতি কৃষককে এক কেজি বীজ ও ২০ কেজি সার বিনামূল্যে বিতরণ করেছে কৃষি বিভাগ।

চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন না থাকায় ফলন ভালো হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী চাষীরা। মুকুল হোসেন নামে এক কৃষক বলেন, ‘আমন ধান ওঠার পর উঁচু জমিতে সবজি, শষা আবাদ করতাম। বিলের জমি পড়ে থাকত। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সরিষা আবাদ করেছি। ফলন ভালো হলে ও দাম ভালো পেলে সামনের বছরও সরিষা চাষ করব।’

সদরের বাহাদুরপুর মাঠে নজরুল ইসলাম নামে এক চাষী বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের নিয়ে বৈঠক করে অনাবাদী জমিতে সরিষা আবাদের বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছে। এরপর বিঘাপ্রতি এক কেজি বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার দিয়েছে। এ সহায়তা পেয়ে সাড়ে ৬ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। এ বছর যারা সরিষা আবাদ করেনি, তারা আমাদের চাষ দেখে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। আগামীতে তারাও সরিষার আবাদ করবে।’

জাহাঙ্গীর আলম নামে অন্য এক কৃষক বলেন, ‘আগে আমরা সরিষা চাষ করতাম না। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আমরা আগ্রহী হয়েছি। এখন ভালো ফলন পেলে পরিশ্রম সার্থক হবে।’ পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনা আরো বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এদিকে যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, ‘আমাদের শরীরে যে ক্যালরি প্রয়োজন তার ৩০ ভাগ তেল ও চর্বি থেকে আসা দরকার। কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯ ভাগ, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আমদানিনির্ভরতা কমানো ও তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরিষার আবাদ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বছর আমাদের সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৯ হাজার ৯০০ হেক্টর। এরই মধ্যে ৩০ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলার আট উপজেলায়ই এ আবাদ করা হয়েছে। কৃষকদের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি।