পৃথিবীর বৃহত্তম বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) বাজার গড়ে তুলেছে চীন। তাতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশটির সুনিপুণ কৌশল, ব্যাপক প্রণোদনা ও টেকসই পরিবহনের প্রবণতা। যদিও বিশ্বব্যাপী অনেক দেশ সক্রিয়ভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য কাজ করছে। কিন্তু চীন খাতটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। খবর জাপান টুডে।
চীনের বাজারে ইভির আধিপত্যের মূল কারণ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বিক্রয়কে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রণোদনার বাস্তবায়ন। কয়েক বছর ধরে বেইজিং ইভি নির্মাতাদের আর্থিক ভর্তুকি, কর মওকুফ ও সরাসরি নির্মাণ সহায়তা দিয়ে আসছে। প্রণোদনা ভোক্তাদের জন্য আর্থিক বাধাকে উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে, ফলে প্রচলিত গ্যাসোলিনচালিত গাড়ির তুলনায় ইলেকট্রিক গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। ২০২২ সালে চীনে বিক্রি হওয়া সব যাত্রীবাহী গাড়ির এক-চতুর্থাংশ ছিল ইলেকট্রিক, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্বে যত ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রি হয়, তার অর্ধেক হয় চীনে।
চীন সরকার ইভি সেক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছে। চীন বিশ্বব্যাপী সর্ববৃহৎ চার্জিং নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু ২০২২ সালে ৬ লাখ ৪৯ হাজার পাবলিক চার্জিং স্টেশন যোগ করা হয়েছে দেশটিতে। সরকারি ভর্তুকিযুক্ত চার্জিং স্টেশনগুলোর প্রাপ্যতা শুধু চালকদের খরচ কমায়নি, ইভি গাড়ির কেনার চাহিদা বাড়িয়েছে। বেইজিংসহ চীনের বহু শহরে ইলেকট্রিক গাড়িগুলো কোনো চার্জিং স্টেশনে চার্জ নেয়ার পরিবর্তে ব্যাটারি পরিবর্তন স্টেশনে গিয়ে চার্জহীন ব্যাটারির বদলে সম্পূর্ণ চার্জ করা ব্যাটারি পরিবর্তন করে নেয়। এতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। অন্যান্য দেশের মতো চীনের অনেক ইলেকট্রিক গাড়িকেই চার্জিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না।
চীন ভোক্তা প্রণোদনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বাইরেও ইভি সেক্টরের প্রসারে নানা ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটি এমন আইন প্রয়োগ করেছে, যা প্রচলিত পেট্রলচালিত গাড়িকে জনগণের মধ্যে নিরুৎসাহিত করছে। চীনে ফসিল ফুয়েলচালিত গাড়ির ক্রেতাদের গাড়ির মূল্যের পাশাপাশি লাইসেন্স প্লেটের জন্যও উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা খুবই ব্যয়বহুল। সাংহাই শহরে একটি জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের জন্য অন্তত ১ লাখ ইউয়ান বা ১৪ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করতে হয়। প্রধান শহরগুলোয় লাইসেন্স প্লেট পেতে লটারি বা নিলামের মতো ব্যবস্থা থাকায় পেট্রল গাড়ির বিক্রি কমেছে। অন্যদিকে ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব সবুজ লাইসেন্স প্লেট পাওয়াকে সহজ করা হয়েছে।
চীনে ২০১৭ সালে অটো শিল্পের জন্য একটি দ্বৈত ক্রেডিট সিস্টেম চালু করা হয়। দেশটিতে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। কার্বন নিঃসরণমুক্ত গাড়ি নির্মাণের জন্য প্রস্তুতকারকদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এছাড়া উচ্চ জ্বালানি খরচের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চীনা সরকারের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। স্থানীয় সংস্থাগুলোকে ইলেকট্রিক বা প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও ট্যাক্সিগুলোকে ইলেকট্রিক যানবাহনে রূপান্তর করে চীন স্থানীয় ইভি নির্মাতাদের জন্য ভালো ব্যবসার পথ তৈরি করেছে।
মূলত বহুমুখী প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ চীনা ইভি ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি বেড়েছে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে। চীন চলতি বছর নতুন যাত্রীবাহী ইভি বিক্রিতে নেতৃত্ব দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।৷আশা করা যায় ইভি সেক্টরে চীনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অন্যান্য দেশের জন্য একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।










