ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থনীতিবিদদের আস্থা মার্চে আরো কমেছে। পরিষেবা ও খুচরা বাণিজ্যে আস্থার গুরুতর পতন ঘটেছে। ইউরো অঞ্চলের সূচক নেমে এসেছে ৯৫ দশমিক ২-এ। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করছে। খবর ইউরো নিউজ।
ইউরোপের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছু সময়ের জন্য বজায় থাকলেও মার্চে ফের আস্থার পতন ঘটে। পরিষেবা ও খুচরা বাণিজ্যে কমে যাওয়া আশাবাদের কারণে আস্থার পতনও নজিরবিহীন। ২৮ মার্চ ইউরোপীয় কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চে ইকোনমিক সেন্টিমেন্ট ইন্ডিকেটর (ইএসআই) ইউরোপীয় ইউনিয়নে দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৯৬-তে নেমে এসেছে এবং ইউরো অঞ্চলে ১ দশমিক ১ পয়েন্ট কমে পৌঁছেছে ৯৫ দশমিক ২-এ, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় ১০০-এর অনেক নিচে। পূর্বাভাসে বলা ৯৭ পয়েন্টের প্রত্যাশাকেও ছুঁতে পারেনি এ সূচক।
টানা দ্বিতীয় মাসের মতো আস্থার পতন এবং ইউরোপের স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন এটি। এ পতনের মূল কারণ পরিষেবা, খুচরা বাণিজ্য এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট। ইউরোজোনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত সেবা খাতে আস্থা ৫ দশমিক ১ পয়েন্ট থেকে ২ দশমিক ৪ পয়েন্টে নেমে গেছে, যা গত চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। ৬ দশমিক ৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ব্যবসার বর্তমান অবস্থা, অতীতের চাহিদা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে এ খাতের দুর্বলতা। খুচরা বাণিজ্যে আস্থাও কমেছে ১ দশমিক ৮ পয়েন্ট, যেখানে বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা এবং মজুদের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আগের কয়েক মাস তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও মার্চের বড় পতন ইঙ্গিত দেয় যে ব্যবসা ও ভোক্তারা আরো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে পুনরায় নিম্নমুখী হয়েছে ভোক্তা আস্থা। পূর্বাভাস অনুযায়ী এ সূচক মান দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ঋণাত্তক ১৪ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। সাধারণ জনগণ তাদের নিজস্ব আর্থিক অবস্থা ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বেশ হতাশ। তবে বড় কেনাকাটার ইচ্ছা কিছুটা বেড়েছে, যা ব্যয় সামান্য স্থিতিশীল রাখতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি কমে যাওয়া এবং বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশার কারণে এটি ঘটে থাকতে পারে।
১০৬ দশমিক ৩ পয়েন্ট নিয়ে সর্বোচ্চ ইকোনমিক সেন্টিমেন্ট ইনডেক্স (ইএসআই) অর্জন করেছে সাইপ্রাস। অন্যদিকে জার্মানি ৮৯ দশমিক ৪ পয়েন্ট নিয়ে আছে সর্বনিম্ন স্থানে। ফেব্রুয়ারির তুলনায় ইউরোপীয় ব্লকের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে বৈচিত্র্যময় প্রবণতা। সবচেয়ে বেশি পতনের সম্মুখীন হয়েছে ফ্রান্স ও ইতালি। দেশ দুটিতে অর্থনৈতিক আস্থা কমেছে যথাক্রমে ২ দশমিক ১ ও ২ পয়েন্ট। অন্যদিকে স্পেনে ইএসআই বেড়েছে ১ দশমিক ১ পয়েন্ট। জার্মানি ও পোল্যান্ডেও সামান্য বেড়েছে ইএসআই এবং তা যথাক্রমে দশমিক ৩ ও দশমিক ২ পয়েন্ট। নেদারল্যান্ডসে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে বড় উন্নতি করেছে চেক প্রজাতন্ত্র, যেখানে ইএসআই ৯৮ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৮ পয়েন্ট বেড়ে ১০১ দশমিক ৫-এ পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোজোন উভয় ক্ষেত্রেই দশমিক ৭ পয়েন্ট কমেছে এমপ্লয়মেন্ট এক্সপেক্টেশনস ইন্ডিকেটর বা কর্মসংস্থান প্রত্যাশা সূচক। খুচরা বাণিজ্যে বড় ধাক্কা খেলেও শিল্প, নির্মাণ এবং সেবা খাতে নিয়োগের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা খুব একটা জোরালো না হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বেকারত্বের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে শ্রমবাজার এখনো জনসাধারণের দৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। লেবার হোর্ডিং সূচক অপরিবর্তিত থেকে ১০ দশমিক ৪ পয়েন্টই রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় ৯ দশমিক ৭-এর বেশি। এতে ইঙ্গিত মেলে, কোম্পানিগুলো এখনো কর্মীদের ছাঁটাই করতে আগ্রহী নয়। এ প্রবণতার পেছনে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউরোপে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হলেও খাতভেদে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। শিল্প ও নির্মাণ খাতে বিক্রয়মূল্যের প্রত্যাশা বৃদ্ধি পেলেও তা সামান্য হ্রাস পেয়েছে সেবা খাতে। সেই সঙ্গে খুচরা বাণিজ্যে অপরিবর্তিত রয়েছে বিক্রয়মূল্য। যদিও সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ওপর মূল্য এখনো প্রত্যাশিত। ভোক্তাদের ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অতীত মূল্য পরিবর্তন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো অপরিবর্তিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তা কার্যকর হবে আগামী সপ্তাহে। ট্রাম্পের এ নতুন শুল্কনীতির কারণে উদ্বিগ্ন ছিলেন বিনিয়োগকারীরা এবং তার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। শুক্রবার ট্রেডিং চলাকালীন ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে পতন অব্যাহত ছিল। এর ফলে ইউরো এসটিওএক্সএক্স ৫০ সূচক শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে এবং সপ্তাহজুড়ে এটি হ্রাস পেয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষত বড় ব্যাংক ও শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কমার্জব্যাংক ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, ডয়চে ব্যাংক ২ দশমিক ৬, বিবিভিএ ২ দশমিক ২ ও ইউনিক্রেডিটের শেয়ারদর কমেছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে ফক্সওয়াগনের ১ দশমিক ৭ শতাংশ, বিএমডব্লিউ ১ দশমিক ৫ ও মার্সিডিজ বেঞ্জের শেয়ারদরে ১ শতাংশ পতন ঘটেছে। দশমিক ৯ শতাংশ শেয়ারদর হারিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলের সবচেয়ে খারাপ পারফরমার হয়েছে মাদ্রিদের আইবেক্স ৩৫। এদিকে ডলারের বিপরীতে ইউরোর মান দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১ দশমিক ০৭৭-এ পৌঁছেছে। মুদ্রাটি গত সাতদিনের মধ্যে ছয়দিনই পতনের সম্মুখীন হয়েছে।










